একজন মানুষ সারাজীবন কাজ করেন। কেউ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, কেউ দোকান চালান, কেউ রিকশা চালান, কেউ ক্ষেতমজুর, কেউ নির্মাণশ্রমিক। জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময়টুকু তিনি ব্যয় করেন পরিবার চালাতে, সন্তান মানুষ করতে, সমাজ ও অর্থনীতিকে সচল রাখতে।
তারপর একদিন শরীর বলে আর পারছি না। সেই দিন থেকে শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি এবার আমাকে কে দেখবে?
বাংলাদেশের প্রচলিত উত্তরটি খুব পরিচিত: সন্তান।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন নাগরিকের বার্ধক্যের নিরাপত্তা কি সন্তানের দায়িত্বের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায়? নাকি এটি রাষ্ট্রেরও একটি মৌলিক দায়িত্ব?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি, কারণ বাংলাদেশ দ্রুত এমন এক ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে যেখানে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়বে, কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত কমবে এবং পরিবারের ওপর বার্ধক্যের অর্থনৈতিক চাপ আরও তীব্র হবে।
সন্তান কি বাংলাদেশের বিকল্প পেনশন ব্যবস্থা?
আমাদের সমাজে বাবা-মাকে দেখাশোনা করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, একটি নৈতিক মূল্যবোধও। সন্তান সামর্থ্য অনুযায়ী বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়াবেন এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
কিন্তু রাষ্ট্র যখন ধরে নেয় যে, সন্তানেরাই বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রধান ও শেষ আশ্রয়, তখন একটি বড় সমস্যা তৈরি হয়।
কারণ সন্তান সব সময় সক্ষম নয়।
কেউ বেকার হতে পারেন। কেউ অসুস্থ হতে পারেন। কেউ বিদেশে থাকতে পারেন। কেউ নিজের সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের ব্যয় সামলাতেই হিমশিম খেতে পারেন। আবার কেউ দায়িত্ব নিতে চান না।
তাহলে বাবা-মায়ের কী হবে?
বাংলাদেশে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে আইন আছে। অর্থাৎ সন্তান দায়িত্ব না নিলে আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু একজন বৃদ্ধ মা কি সত্যিই নিজের ছেলের বিরুদ্ধে থানায় যেতে পারবেন? একজন বাবা কি মেয়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করতে চাইবেন?
আইন থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভালোবাসা, নির্ভরতা ও পারিবারিক সম্পর্কের সংকটের সমাধান শুধু আদালতের মাধ্যমে হয় না।
বরং এই বাস্তবতা আমাদের আরও বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় ‘রাষ্ট্র কি নিজের দায়িত্ব পালন করতে না পেরে সন্তানকে আইনি পেনশন ব্যবস্থায় পরিণত করছে?
অনানুষ্ঠানিক খাতের কোটি মানুষের অবসর কোথায়?
বাংলাদেশের অধিকাংশ কর্মজীবী মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। তাদের নিয়োগপত্র নেই, প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই, গ্র্যাচুইটি নেই, নিশ্চিত পেনশন নেই। তাদের জীবনে অবসরের কোনো নির্দিষ্ট তারিখও নেই। তারা কাজ করতে করতে একদিন আর কাজ করতে পারেন না।
রিকশাচালক, গৃহকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানের কর্মচারী কিংবা ক্ষেতমজুর তাদের জন্য বার্ধক্যের সবচেয়ে বড় সামাজিক নিরাপত্তা এখনো পরিবার।
অর্থাৎ সারাজীবন কাজ করার পরও একজন মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার সন্তানের আর্থিক সক্ষমতা ও সদিচ্ছার ওপর।
এটি কোনো টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা হতে পারে না। কারণ সন্তান ভালোবাসা দিতে পারেন, সহায়তা দিতে পারেন; কিন্তু রাষ্ট্রের বিকল্প হতে পারেন না।
বয়স্ক ভাতা কি নিরাপত্তা?
রাষ্ট্রের বয়স্ক ভাতা আছে। কিন্তু সেই অর্থ একজন প্রবীণের বাস্তব জীবনের ব্যয় বহনের জন্য কতটা যথেষ্ট?
খাদ্য, বাসা, ওষুধ, চিকিৎসা, যাতায়াত এসবের ব্যয় বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয়ে যায়, সামান্য মাসিক সহায়তা সামাজিক নিরাপত্তার পূর্ণ বিকল্প নয়। এটি সহায়তা, কিন্তু নিরাপত্তা নয়। একজন প্রবীণ নাগরিকের প্রয়োজন শুধু হাতে কিছু টাকা নয়। তার দরকার
- নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য আয়;
- চিকিৎসা ব্যয়ের সুরক্ষা;
- নিরাপদ বাসস্থান;
- প্রতারণামুক্ত সঞ্চয়ের সুযোগ;
- দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা;
- এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।
বার্ধক্যকে যদি আমরা শুধু ‘ভাতা পাওয়ার বিষয়’ হিসেবে দেখি, তবে সমস্যার আসল গভীরতা ধরা পড়বে না।
সন্তান না দেখলে কি বৃদ্ধাশ্রম?
এই প্রশ্নের উত্তরও সহজ নয়।
বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য সরকারি আবাসনের ব্যবস্থা সীমিত। বেসরকারি বৃদ্ধাশ্রমও সবার জন্য সহজলভ্য নয়। সেখানে ব্যয় আছে, শর্ত আছে, মানের ভিন্নতা আছে।
সবচেয়ে বড় কথা, দরিদ্র একজন প্রবীণের জন্য বৃদ্ধাশ্রম কোনো নিশ্চিত সামাজিক নিরাপত্তা নয়।
ফলে বাস্তবতা দাঁড়ায় এমন সন্তান দেখলে ভালো। সন্তান না দেখলে মামলা। মামলা না করলে বৃদ্ধাশ্রম।
বৃদ্ধাশ্রমে টাকা না থাকলে?
এই প্রশ্নের উত্তরটাই বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শূন্যতা।
সঞ্চয়ও নিরাপদ নয়
একজন মানুষ কর্মজীবনে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়েছেন। তিনি ভেবেছেন, শেষ জীবনে এই টাকা তার কাজে আসবে। কিন্তু সেই সঞ্চয়ের সামনে আছে নানা ঝুঁকি।
প্রতারণা, ভুয়া বিনিয়োগ, অনিয়ন্ত্রিত সমিতি, ডিজিটাল প্রতারণা, উচ্চ মুনাফার লোভ, অনলাইন বেটিং—বিভিন্ন পথে মানুষের সারাজীবনের সঞ্চয় হারিয়ে যাচ্ছে।
এখানে শুধু মানুষের লোভের কথা বললে পুরো সত্য বলা হয় না। যে দেশে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ পেনশন ব্যবস্থার আওতায় সবাই নেই, যে দেশে মূল্যস্ফীতি সঞ্চয়ের মূল্য কমিয়ে দেয়, যে দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয় সেখানে দ্রুত বেশি লাভের প্রলোভন অনেক মানুষের কাছে আশার পথ বলেই মনে হয়।
রাষ্ট্র যখন নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তখন প্রতারকরা সেই ভবিষ্যতের স্বপ্ন বিক্রি করে।
চিকিৎসা: বার্ধক্যের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি
বার্ধক্যের সঙ্গে চিকিৎসার সম্পর্ক অস্বীকার করার উপায় নেই।
ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা বছরের পর বছর চলতে পারে। আর চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ যদি পরিবারকেই বহন করতে হয়, তাহলে অবসরের সঞ্চয় দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
তখন একজন প্রবীণ শুধু নিজের জন্য উদ্বিগ্ন থাকেন না। তিনি ভাবতে থাকেন আমি অসুস্থ হলে আমার সন্তানের সংসার কি ভেঙে পড়বে?
এটি কোনো ব্যক্তিগত উদ্বেগ নয়। এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট।
কারণ বার্ধক্যে চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে এটি আমরা জানি। প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়বে এটিও জানি। তবু সেই ভবিষ্যতের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই।
আজকের সন্তান, আগামী দিনের প্রবীণ
এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আজ যারা সন্তান, তারাও একদিন বৃদ্ধ হবেন।
আজ যে মানুষটি তার বাবা-মায়ের চিকিৎসার ব্যয় বহন করছেন, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ দিচ্ছেন, নিজের সংসার চালাচ্ছেন আগামীকাল তিনিও হয়তো একইভাবে তার সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হবেন।
কিন্তু আগামী প্রজন্মের ওপর আমরা কতটা দায় চাপিয়ে যেতে চাই?
একটি কর্মজীবী দম্পতির ওপর যদি দুই সেট বৃদ্ধ বাবা-মা, নিজেদের সন্তান এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ চিকিৎসার দায় এসে পড়ে, তাহলে সেই পরিবারকে শুধু নৈতিকতার শিক্ষা দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না।
- এটি অর্থনীতির প্রশ্ন।
- এটি জনসংখ্যার প্রশ্ন।
- এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
বার্ধক্যের নিরাপত্তা দয়া নয়, অধিকার
রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে প্রবীণদের নিরাপত্তা কোনো দাতব্য কর্মসূচি নয়। এটি একজন নাগরিকের মর্যাদার প্রশ্ন।
যে মানুষটি সারাজীবন দেশের অর্থনীতিতে শ্রম দিয়েছেন, পরিবার গড়েছেন, কর দিয়েছেন বা অন্তত ভোক্তা হিসেবে অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন বার্ধক্যে তার বেঁচে থাকা কারও করুণার ওপর নির্ভর করতে পারে না।
সন্তান বাবা-মাকে দেখবেন এটি মূল্যবোধ। কিন্তু রাষ্ট্র নাগরিককে নিরাপত্তা দেবে এটি দায়িত্ব।
দুইটিকে এক করে ফেললে রাষ্ট্রের দায় আড়াল হয়ে যায়।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি বাস্তবসম্মত ও সর্বজনীন বার্ধক্য নিরাপত্তা কাঠামো। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য সহজ পেনশন, নিরাপদ দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, প্রবীণ পরিচর্যা, সাশ্রয়ী আবাসন এবং আর্থিক প্রতারণা থেকে সুরক্ষা সবকিছুকে একসঙ্গে ভাবতে হবে। আগামী দিনের বাংলাদেশ শুধু তরুণদের দেশ থাকবে না।
বাংলাদেশ দ্রুত একটি প্রবীণ সমাজে পরিণত হবে। সেই দিনের জন্য প্রস্তুতি আজ না নিলে, আগামী দিনের প্রবীণরা আবারও একই প্রশ্ন করবেন
সারাজীবন কাজ করলাম, এখন আমাকে কে দেখবে?
আর আমরা কি তখনও একই উত্তর দেব ‘সন্তান ভালো হলে দেখবে’?
বার্ধক্যের নিরাপত্তা সন্তানের দয়া হতে পারে না। এটি হতে হবে নাগরিকের অধিকার।
লেখক: মিজান মাজনুন
সাংবাদিক ও আইনজীবী।

