আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি বিনিয়োগ রেকর্ড এক ট্রিলিয়ন ইয়েনে, অর্থাৎ প্রায় ৬ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে টোকিও। রাজধানী টোকিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ ঘোষণায় এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী, এই বিনিয়োগে বাংলাদেশে অন্তত দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
বৈঠকে দুই নেতার উপস্থিতিতে জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্য বাড়ানো, শিল্প খাতে বৈচিত্র্য আনা এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের সফল উত্তরণে এই চুক্তি বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। দুই নেতা চুক্তির সব আনুষ্ঠানিকতা দ্রুত শেষ করে একে অবিলম্বে কার্যকর করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে গত ২৬ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে টোকিও পৌঁছান তারেক রহমান। সফর শেষ হবে ২৮ অক্টোবর, আর ২৯ অক্টোবর তিনি ঢাকায় ফিরবেন। স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টায় তাঁকে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানানো হয়। এ সময় তাঁকে লাল গালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এরপর ১১টা ৪৫ মিনিটে শুরু হয় দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। বৈঠক ও যৌথ সংবাদ সম্মেলনের পর প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে নিজ কার্যালয়ে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন তাকাইচি। সেখানে তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
দুই দেশ তাদের প্রধান অবকাঠামো কৌশল বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট, সংক্ষেপে বিগ-বিকে নতুন রূপ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এখন এর নাম হবে ‘শেয়ার্ড প্রসপারিটির জন্য বিগ-বি’। উদ্যোগের মূল লক্ষ্য মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে বিদ্যুৎ, বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোকে একসূত্রে গেঁথে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে এশিয়ার অন্যতম প্রধান লজিস্টিকস ও উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।
এই বিনিয়োগ-প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। টিবিএসের সঙ্গে আলাপে তাঁরা বলেছেন, এতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং উচ্চ প্রযুক্তির জ্ঞান বাংলাদেশে আসার পথ সহজ হবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ভারী শিল্প, অটোমোবাইল ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে জাপানের বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও দক্ষতা রয়েছে। তাই এসব খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগে তাদের আগ্রহ অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। তবে তাঁর মতে, বাংলাদেশকে নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তা করা গেলে জাপানি বিনিয়োগ দেশীয় শিল্প খাতের কমপ্লায়েন্স, শ্রম অধিকার ও পরিবেশগত মান উন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, জাতীয় অর্থনীতির এক সংকটময় সময়ে এই বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে। এটি বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য সুরক্ষায় সহায়তা করবে এবং আঞ্চলিক সংযোগের নতুন পথ খুলে দেবে। তিনি সরকারকে এ বিনিয়োগ বাস্তবায়নে দ্রুত সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার আহ্বান জানান।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, জাপান বাংলাদেশের বিশ্বস্ত অংশীদার, যাদের বিনিয়োগের পেছনে কোনো গোপন রাজনৈতিক এজেন্ডা থাকে না। তাঁর মতে, দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে গঠনমূলক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার জন্যও এটি বড় সুযোগ।
বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতেও একাধিক বিষয়ে একমত হয়েছেন দুই নেতা। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর লক্ষ্যে প্রাথমিক প্রস্তুতি শেষ করা হবে। রাজধানীতে মেট্রোরেলের নতুন লাইনগুলোর নির্মাণকাজও ত্বরান্বিত করা হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় জাপানের পাওয়ার এশিয়া কাঠামোর আওতায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তারেক রহমান। জবাবে তাকাইচি বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার ঘাটতি পূরণে সহযোগিতার কথা বলেন। জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত সদ্য স্বাক্ষরিত লেটার অব ইনটেন্টের আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তারেক রহমান ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ আরও সুসংহত করার অঙ্গীকার করেছেন। এর অংশ হিসেবে স্বচ্ছতা বাড়ানো, নিয়ন্ত্রণমূলক জটিলতা কমানো এবং কাস্টমস, কর, লাইসেন্স ও লভ্যাংশ প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া সহজ করা হবে। ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) একটি সহযোগিতা স্মারক সই করেছে। এ ছাড়া খাদ্য, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বিনিয়োগ আকর্ষণে আরও দুটি স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে প্রস্তাবিত ইয়েন-ঋণ প্রকল্পকেও স্বাগত জানিয়েছেন দুই সরকারপ্রধান।
আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ বা আরসেপে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির আলোচনাকেও স্বাগত জানিয়েছেন তাকাইচি। তিনি জানান, বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক আবেদনসংক্রান্ত আলোচনা ও দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে জাপান সহযোগিতা দিতে রাজি। দুই নেতা একটি অবাধ, ন্যায্য ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। মিয়ানমারের ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকট, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও সীমান্তপেরিয়ে অপরাধ বৃদ্ধি নিয়ে যৌথ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁরা। রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হিসেবে মিয়ানমারে তাঁদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর একমত হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নেওয়ায় তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান তাকাইচি। তিনি নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, জাপানের পাঠানো নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল সরাসরি এই প্রক্রিয়া দেখেছে। বাংলাদেশের প্রাণবন্ত গণতন্ত্রেরও প্রশংসা করেন তিনি।
শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকার ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা জোরদার করতেও সম্মত হয়েছেন দুই নেতা। সম্পর্ক ও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ধরে রাখতে তারেক রহমান মন্ত্রী পর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর মতে, অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করা এবং সহযোগিতার সম্ভাবনাকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দিতে এ কমিশন কাজ করবে। তিনি এই শীর্ষ বৈঠককে গভীর আস্থা, বিস্তৃত অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক শান্তির ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন দিগন্ত বলে বর্ণনা করেন।
চার দিনের সফরে তারেক রহমান ফুতসুতে জেরার এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ইচিকাওয়ায় নিটসুর লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেছেন। জাপানের জনগণ ও সরকারের আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি সুবিধাজনক সময়ে তাকাইচিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে ইপিএ স্বাক্ষর, বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এবং অবকাঠামো ও জ্বালানি সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক গতি ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।

