পদ্মা নদীর ওপর প্রস্তাবিত ব্যারাজ প্রকল্পকে দ্রুত বাস্তবায়নের পথে নিতে চায় সরকার। আগামী বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রকল্পটির কাজ দৃশ্যমান করার প্রত্যয় জানিয়েছেন পানি সম্পদমন্ত্রী মো. শাহিদউদ্দিন চৌধুরী এনি। তাঁর দাবি, দেশের ২৪ থেকে ২৬টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষের কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও জীবিকার সঙ্গে প্রকল্পটির স্বার্থ জড়িত। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের পুরো নির্মাণকাজ আগামী বছরের মধ্যে শেষ হচ্ছে না। প্রকল্পটির প্রথম ধাপের বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত।
ঢাকার ধানমন্ডিতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের (বিলিয়া) আয়োজিত ‘গঙ্গা পানি চুক্তি: পুনর্নবীকরণের বিষয়গুলো’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। একই অনুষ্ঠানে আগামী মাসে জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষে গঙ্গা পানি চুক্তি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে শক্ত অবস্থানের বক্তব্য আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। বিষয়টি এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-ভারত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হওয়ার কথা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জানিয়েছিল, তখন পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন নিয়ে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি।
পদ্মা ব্যারাজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মূল ভাবনা শুধু নদীর ওপর একটি বাঁধ নির্মাণ নয়। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বর্ষার পানি ধরে রাখা, শুষ্ক মৌসুমে পানির জোগান বাড়ানো, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর প্রবাহ ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। মে মাসে একনেকে অনুমোদিত প্রথম ধাপের প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। এর আওতায় রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা নদীর ওপর প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের অধীনে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যও রয়েছে।
এর অর্থনৈতিক গুরুত্বটা বোঝা যায় কৃষি ও পানির চাহিদার দিকে তাকালে। বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা অনেক এলাকায় বেড়েছে। অন্যদিকে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ও নদীভাঙন আবার অন্য ধরনের সমস্যা তৈরি করে। একটি বড় জলাধার ও নিয়ন্ত্রিত পানি প্রবাহের ব্যবস্থা থাকলে একই অবকাঠামো দিয়ে এক মৌসুমে পানি ধরে রাখা এবং অন্য মৌসুমে তা কৃষি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পটি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দেশের এলাকার ওপর প্রভাব ফেলবে এবং ১৯টি জেলার পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, নদীর নাব্যতা, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার মতো সমস্যায় প্রভাব রাখার লক্ষ্য রয়েছে।
গঙ্গার পানি নিয়ে নতুন সমীকরণ
পদ্মা ব্যারাজের আলোচনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব শুরু হয়েছে। ১৯৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় গঙ্গার পানি ১০ দিনভিত্তিক হিসাবের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভাগ হওয়ার কথা। চুক্তিটির মেয়াদ ৩০ বছর এবং পারস্পরিক সম্মতিতে তা নবায়নের সুযোগ রয়েছে।
এবারের আলোচনায় বাংলাদেশের জন্য বড় প্রশ্ন শুধু চুক্তি নবায়ন হবে কি না, বরং নতুন চুক্তিতে পানির নিশ্চয়তা কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়। সেমিনারে ভবিষ্যৎ পানি বণ্টন চুক্তিতে তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে থাকা ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ পুনর্বিবেচনার দাবি উঠেছে। তবে ১৯৭৭ সালের চুক্তির সেই ধারা ও ১৯৯৬ সালের চুক্তির কাঠামো এক নয় তাই নতুন আলোচনায় কোন পুরোনো ব্যবস্থা কীভাবে ফিরবে, সেটি কূটনৈতিক ও কারিগরি আলোচনার বিষয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন কাঠামো নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ব্যারাজ কি গঙ্গার পানি পাওয়ার বিকল্প?
এখানেই পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তৈরি হয়। দেশের ভেতরে পানি ধরে রাখার সক্ষমতা বাড়ানো অবশ্যই পানি ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এটি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির বিকল্প নয়। কারণ গঙ্গা-পদ্মার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ নির্ভর করে বৃহত্তর আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থার ওপর। একটি দেশের ভেতরে ব্যারাজ নির্মাণ করে পানির ব্যবস্থাপনা উন্নত করা যায়, কিন্তু উজান থেকে নদীতে পর্যাপ্ত পানি না এলে দীর্ঘমেয়াদে সেই ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই দেশের অভ্যন্তরীণ পানি অবকাঠামো এবং ভারতের সঙ্গে পানি কূটনীতি দুটিকে আলাদা হলেও পরস্পরসম্পর্কিত নীতি হিসেবে দেখতে হবে।
এ কারণে প্রকল্পটির পরিবেশগত ও নদী ব্যবস্থাপনার প্রভাব নিয়েও সতর্কতা রয়েছে। পরিবেশবাদীদের একটি অংশ আশঙ্কা করছে, পদ্মার ওপর ব্যারাজ নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পলি পরিবহন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে এবং এর প্রভাব অন্য নদী ও নিম্নাঞ্চলেও পড়তে পারে। ফলে ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের এই প্রকল্পে শুধু নির্মাণ শুরু করাই যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদে নদীর গতিপ্রকৃতি, পলি, মাছ, কৃষি, লবণাক্ততা এবং নিম্নপ্রবাহের ওপর প্রভাব নিয়মিত পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে ২০২৬-এর শেষ, হাতে সময় কম
গঙ্গা পানি চুক্তির সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশের সামনে তাই দুটি সমান্তরাল কাজ। একদিকে দেশের নিজস্ব পানি সংরক্ষণ, সেচ ও নদী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে; অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে নতুন পানি বণ্টন কাঠামো নিয়ে কার্যকর আলোচনা এগিয়ে নিতে হবে। চলতি বছরের মে মাসে দুই দেশের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা ফারাক্কা ব্যারাজ এলাকায় যৌথ পরিদর্শনও করেছেন এবং পানি প্রবাহের তথ্য পর্যালোচনার প্রক্রিয়া এগিয়েছে। অর্থাৎ চুক্তি নবায়নের বিষয়টি এখন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের পর্যায়ে নেই, কারিগরি তথ্যও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সেমিনারে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল নতুন চিন্তার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। আলোচকদের পক্ষ থেকে সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার আওতায় খাতভিত্তিক পানির চাহিদা নির্ধারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই জায়গাটিই ভবিষ্যৎ পানি নীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে শুধু কত পানি পাওয়া যাবে এই প্রশ্নে আটকে না থেকে কৃষি, নৌপরিবহন, পরিবেশ, শিল্প, মৎস্য, পানীয় জল ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সবকিছুর প্রয়োজন একসঙ্গে হিসাব করে আলোচনায় যেতে হবে।
পদ্মা ব্যারাজের কাজ আগামী কয়েক মাসে দৃশ্যমান করার মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি তাই বড় একটি পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু এর সাফল্য শুধু ব্যারাজের নির্মাণে নয়। প্রকল্পটি যদি সত্যিই কৃষি, নদী, পরিবেশ ও পানির নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল দিতে পারে, তাহলে এর অর্থনৈতিক মূল্যও বড় হবে। আর সেই অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার সঙ্গে যদি গঙ্গা পানি চুক্তিতে বাংলাদেশের ন্যায্য ও টেকসই পানির অধিকার নিশ্চিত করা যায়, তখনই পদ্মা ব্যারাজকে একটি বিচ্ছিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের বদলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখা সম্ভব হবে।

