ভূমিসেবা খাতে দুর্নীতি ও নাগরিক হয়রানি কমাতে দেশের সব জেলা প্রশাসককে সুনির্দিষ্ট ১৪ দফা নির্দেশনা দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। উপজেলা ভূমি অফিস, রাজস্ব সার্কেল এবং ইউনিয়ন ও পৌর পর্যায়ের ভূমি অফিসগুলোতে নিয়মিত তদারকি চালানোর মাধ্যমে দালাল ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাইজেশন, নলেজ ম্যানেজমেন্ট ও পারফরমেন্স-সংক্রান্ত একটি অনুবিভাগ থেকে দেশের সব জেলা প্রশাসকের কাছে এই নির্দেশনা সংবলিত চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, জেলার ভূমি প্রশাসনের প্রধান হিসেবে মাঠপর্যায়ের সব ভূমি অফিসের কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব মূলত জেলা প্রশাসকেরই। তাই ভূমিসেবার মান বাড়াতে, নাগরিক ভোগান্তি কমাতে এবং দাপ্তরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়মিত মনিটরিং চালিয়ে যেতে হবে তাঁদের।
নির্দেশনাগুলোর মধ্যে সবার আগে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়মতো উপস্থিতি ও দাপ্তরিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার বিষয়ে। পাশাপাশি নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, খতিয়ান ও রেকর্ড সংশোধনসহ বিভিন্ন সেবা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে চিঠিতে।
ডিজিটাল সেবার মান নিয়েও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এতে। অনলাইন ভূমিসেবা, ই-নামজারি এবং ডিজিটাল রেকর্ড ব্যবস্থাপনার মতো তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবাগুলো ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা নিয়মিত পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দালাল ও দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি কোনো অভিযোগ পাওয়ামাত্র দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসকদের প্রতি।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ভূমিসেবার নির্ধারিত ফি, প্রক্রিয়া ও সময়সীমা দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শনের কথাও বলা হয়েছে চিঠিতে। পাশাপাশি অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য নির্ধারিত ডিজিটাল ব্যবস্থা যথাযথভাবে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা সমাধানের নির্দেশনাও রয়েছে। এ ছাড়া ভূমি অফিসের পরিচ্ছন্নতা, নথি ও রেকর্ড সংরক্ষণ, তথ্য বোর্ড এবং নাগরিক সনদ হালনাগাদ আছে কি না, তা যাচাইয়ের কথাও বলা হয়েছে।
কারিগরি অবকাঠামোর দিকেও নজর দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে চিঠিতে—কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক ও সার্ভারসহ সরকারি আইটি সরঞ্জামের সঠিক ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে জেলা প্রশাসকদের। পাশাপাশি ভূমি অফিসে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করার কথাও বলা হয়েছে। বিদ্যমান ভূমি আইন, বিধি ও পরিপত্র যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ের নির্দেশও রয়েছে তালিকায়।
সেবা সহজলভ্য করতে ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো এবং সেগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত তদারকির কথাও বলা হয়েছে। বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আকস্মিক পরিদর্শনের ওপর—কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই ভূমি অফিস পরিদর্শন করে বাস্তব চিত্র যাচাই করতে হবে, আর কোনো অনিয়ম চিহ্নিত হলে তা লিখিতভাবে সংরক্ষণসহ সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। গুরুতর দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে স্পষ্টভাবে।
সবশেষে, এই পুরো মনিটরিং কার্যক্রমের অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও গৃহীত পদক্ষেপ উল্লেখ করে প্রতি মাসের প্রতিবেদন পরবর্তী মাসের ১০ তারিখের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসকদের।
ভূমি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রত্যক্ষ তদারকি ও কার্যকর নেতৃত্বের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে ভূমিসেবার মান উন্নয়ন, সেবাপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কমানো এবং একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব ভূমি প্রশাসন গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

