বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এর ধারা ১৯ বিশেষ বিধানের উৎস হিসেবে বিবেচিত। এ আইনে ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ বা ‘Special Circumstances” বিধানটি সাধারণত অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিবাহের ক্ষেত্রে বিচারিক নমনীয়তার সুযোগ তৈরি করে, যা বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যে এক ধরনের আদর্শগত বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এই বিধান বিচারকদের যেমন ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেয়, অন্যদিকে বিচারিক বিবেচনার অতি-ব্যবহার বা স্বেচ্ছাচারিতার নামে, বিশেষ অনুমতির এই নমনীয়তা অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক চাপের মুখে নতিস্বীকার করার উদাহরন।
বর্তমানে ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ হিসেবে মূলত ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথা বা প্রাক-বৈবাহিক গর্ভাবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যা বিচারিক ব্যাখ্যার ভিন্নতার কারণে শিশুর সুরক্ষার চেয়ে সামাজিক রীতিনীতিকে বেশি গুরুত্ব প্রদানের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। বিবাহ সংক্রান্ত ছাড়পত্র বা ‘ডিসপেনসেশন’ প্রদানের ক্ষেত্রে বিচারিক নজিরসমূহ প্রায়শই প্রথাগত সামাজিক চাপের বিপরীতে শিশুর অধিকার সুরক্ষার চেয়ে বাস্তব পরিস্থিতির চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে।
আইনি পর্যালোচনা
২০১৭ সালে প্রণীত হয় বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনটি বিয়ের ন্যূনতম বয়স মেয়েদের জন্য ১৮ এবং ছেলেদের জন্য ২১ বছর নির্ধারণ করে এবং এর ব্যত্যয়কে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। তবে আইনের ১৯ ধারায় সন্নিবেশিত একটি ‘বিশেষ বিধান’ এই সাধারণ নিয়মের একটি ব্যতিক্রম তৈরি করে।
বিধি ১৭ অনুযায়ী, বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্তবয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থে, আদালতের নির্দেশ এবং পিতা-মাতা বা অভিভাবকের সম্মতিক্রমে, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিবাহ সম্পাদিত হলে তা এই আইনের অধীন অপরাধ বলে গণ্য হবে না।
কিন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিনটি শর্তের সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ঃ
আদালতের নির্দেশ — চূড়ান্ত অনুমোদন আদালতের হাতে।
পিতা–মাতা/অভিভাবকের সম্মতি — আবেদনটি তাদের পক্ষ থেকেই আসতে হয়।
অপ্রাপ্তবয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থ — এটাই মানদণ্ড, যা বিচারক বিবেচনা করেন।
চূড়ান্ত ক্ষমতা বিচারিক আদালতের হলেও, উদ্যোগ ও সম্মতি আসে অভিভাবকের কাছ থেকে। নিজের বিয়ে সম্পর্কে অপ্রাপ্তবয়স্কের নিজের কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্তের সুযোগ আইনে স্পষ্টভাবে নেই।
পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি
অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বা আত্মহত্যার ঝুঁকির মতো চরম সামাজিক পরিস্থিতিতে কঠোর বয়সসীমা প্রয়োগ করলে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও সম্ভাব্য সন্তানের সামাজিক-আইনি অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে বলে যুক্তি দেওয়া হয়। সাথে কেবল অভিভাবকের ইচ্ছাতেই সিদ্ধান্ত না হয়ে আদালতের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হওয়ায় একটি নিরপেক্ষ পর্যালোচনার স্তর যুক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে বলা হয়ে থাকে যে, বিশেষ ক্ষেত্র’ ও ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’-এর কোনো সংজ্ঞা বা ন্যূনতম বয়সসীমা না থাকায়, তাত্ত্বিকভাবে যেকোনো বয়সেই এই বিধানের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই আইনের নিজস্ব দণ্ড-বিধান (ধারা ৭ ও ৮) এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক; একদিকে বাল্যবিবাহে সহায়তার জন্য অভিভাবকের শাস্তির বিধান রয়েছে, অন্যদিকে তাদেরই সম্মতিতে ব্যতিক্রমী বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, দারিদ্র্য, সামাজিক কলঙ্ক বা আইনি জটিলতা এড়াতে বিয়েকে ‘সমাধান’ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া মূল সমস্যা এইখানে।
আন্তর্জাতিক আইনের ভাষা কী বলে?
সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (UDHR), ১৯৪৮
ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ ১৬(২) অনুযায়ী, বিয়ে কেবল উভয় পক্ষের মুক্ত ও সম্পূর্ণ সম্মতিতেই সম্পন্ন হতে পারবে। এটি বাল্যবিবাহ-বিরোধী আন্তর্জাতিক আইনি অবস্থানের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়, যদিও এতে সুনির্দিষ্ট ন্যূনতম বয়স উল্লেখ নেই।
জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (CRC), ১৯৮৯
অনুচ্ছেদ ১ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে যে কেউ শিশু হিসেবে গণ্য। তবে খসড়া প্রণয়নের সময়কার মতপার্থক্যের কারণে CRC-তে বিয়ে সংক্রান্ত কোনো সরাসরি ধারা অন্তর্ভুক্ত হয়নি। আবার CRC কমিটি ও CEDAW কমিটি যৌথভাবে মন্তব্য (CRC-এর জেনারেল কমেন্ট নং ১৮ ও CEDAW-এর জেনারেল রেকমেন্ডেশন নং ৩১)-এ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যে শিশু বিয়েকে জোরপূর্বক বিয়ের একটি রূপ হিসেবে গণ্য করা উচিত, কারণ এতে অন্তত এক পক্ষের সম্পূর্ণ, মুক্ত ও অবহিত সম্মতি অনুপস্থিত থাকে। বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে CRC অনুসমর্থন করে, এবং CRC কমিটি একাধিকবার পর্যালোচনায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। ২০১৫ সালের পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনায় কমিটি বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের প্রকোপ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।
CEDAW, ১৯৭৯
অনুচ্ছেদ ১৬(২) স্পষ্টভাবে বলে যে শিশুর বাগদান বা বিয়ের কোনো আইনি কার্যকারিতা থাকবে না, এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে বিয়ের জন্য ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ ও বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ১৯৯৪ সালের জেনারেল রেকমেন্ডেশন নং ২১-এ CEDAW কমিটি এই অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিয়ে বলে যে ন্যূনতম বয়স ১৮ হওয়া বাঞ্ছনীয়। বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালে CEDAW-এ যোগ দেয়, তবে অনুচ্ছেদ ২ এবং ১৬(১)(গ)-এ সংরক্ষণ (reservation) জ্ঞাপন করে রেখেছে, কারণ রাষ্ট্রের অবস্থান অনুযায়ী এই ধারাগুলো শরিয়া আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ২০১৬ সালের পর্যালোচনায় CEDAW কমিটি বাংলাদেশকে বাল্যবিবাহের মূল কারণ মোকাবিলা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার আহ্বান জানায়।
আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থা ও পর্যবেক্ষকদের প্রতিক্রিয়া
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইনটি সংসদে পাস হওয়ার পরপরই এর ধারা ১৯ নিয়ে ব্যাপক আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট একটি রেজোলিউশনে (B8-0264/2017) বাংলাদেশ সরকারকে আইনটি সংশোধন করে ব্যতিক্রমহীনভাবে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর বজায় রাখতে আহ্বান জানায়, এবং উল্লেখ করে যে নতুন আইনে ‘বিশেষ ক্ষেত্র’ বা ‘বৃহত্তর কল্যাণ’-এর কোনো সংজ্ঞা না থাকায় এটি অপব্যবহারের ঝুঁকিতে উন্মুক্ত। শিশু অধিকার সংক্রান্ত জোট, একই উদ্বেগ প্রকাশ করে যে বিধানে কোনো ন্যূনতম বয়স না থাকায় ১৪-১৫ বছর বয়সেও বিয়ে সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে সরকারপক্ষের যুক্তি ছিল যে এই বিধান গ্রামীণ বাস্তবতা বিবেচনায় প্রণীত এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েই প্রণয়ন করা হয়েছে।
দেশীয়-আন্তর্জাতিক আইনি দ্বন্দ্ব
বাংলাদেশ একটি দ্বৈতবাদী (dualist) আইনি ব্যবস্থা অনুসরণ করে, যেখানে কোনো আন্তর্জাতিক সনদ অনুসমর্থন করলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশীয় আইনে পরিণত হয় না। দেশীয় সংসদে রূপান্তরিত (transform) না হলে তা আদালতে সরাসরি প্রয়োগযোগ্য নয়। এই কাঠামোগত বাস্তবতার কারণেই CRC ও CEDAW অনুসমর্থন সত্ত্বেও, ধারা ১৯-এর মতো একটি ব্যতিক্রম বিধান জাতীয় সংসদে পাস হলে তা দেশীয়ভাবে সম্পূর্ণ বৈধ থেকে যায়, যদিও তা আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই দ্বন্দ্বই ২০১৭ সালে হাইকোর্ট বিভাগে দায়ের হওয়া একটি রিট আবেদনের মূল ভিত্তি ছিল, যেখানে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল ধারা ১৯ কীভাবে সংবিধান এবং শিশু-নারী অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের (CRC, CEDAW-সহ অতিরিক্ত প্রটোকলসমূহ) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা জানতে চেয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেছিল।
আন্তর্জাতিক আইনি নীতি অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র সনদে সংরক্ষণ (reservation) জ্ঞাপন করলেও তা যদি সনদের মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের (object and purpose) সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তবে ভিয়েনা কনভেনশন অন দ্য ল অব ট্রিটিজ (VCLT)-এর অনুচ্ছেদ ১৯(গ) অনুযায়ী তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। সেক্ষেত্রে বলা যায়, , বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এর ধারা ১৯ দেশীয় আইনি কাঠামোয় বৈধ হলেও, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের বিকশিত মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থানে রয়েছে।

