Close Menu
Citizens VoiceCitizens Voice
    Facebook X (Twitter) Instagram YouTube LinkedIn WhatsApp Telegram
    Citizens VoiceCitizens Voice শনি, আগস্ট 29, 2026
    • প্রথমপাতা
    • অর্থনীতি
    • বাণিজ্য
    • ব্যাংক
    • পুঁজিবাজার
    • বিমা
    • কর্পোরেট
    • বাংলাদেশ
    • আন্তর্জাতিক
    • আইন
    • অপরাধ
    • মতামত
    • অন্যান্য
      • খেলা
      • শিক্ষা
      • স্বাস্থ্য
      • প্রযুক্তি
      • ধর্ম
      • বিনোদন
      • সাহিত্য
      • বিশ্ব অর্থনীতি
      • ভূ-রাজনীতি
      • জলবায়ু ও পরিবেশ
      • লাইফস্টাইল
      • বিশ্লেষণ
      • ভিডিও
    Citizens VoiceCitizens Voice
    Home » মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ‘ভগত সিং’ কেন ঈশ্বরকে অস্বীকার করেছিলেন?
    বিশ্লেষণ

    মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ‘ভগত সিং’ কেন ঈশ্বরকে অস্বীকার করেছিলেন?

    এফ. আর. ইমরানআগস্ট 27, 2026
    Facebook Twitter Email Telegram WhatsApp Copy Link
    ভগৎ সিং
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Telegram WhatsApp Email Copy Link

    মাত্র ২৩ বছর বয়সেই চোখের সামনে ভাসছে মৃত্যুদণ্ড। লাহোর সেন্ট্রাল জেলের ছোট্ট একটি কক্ষে বসে একজন তরুণ জানতেন, তার জীবনের শেষ অধ্যায় প্রায় এসে গেছে। বাইরে তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তার ক্ষমতার চূড়ায়। আর সেই সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অপরাধে কয়েক মাসের মধ্যেই তাকে ফাঁসির মঞ্চে উঠতে হবে।

    কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও ভগত সিংয়ের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল নিজের জীবন বাঁচানো নয়। বরং তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া একটি অভিযোগের উত্তর দেওয়া- তিনি কি অহংকারের কারণে নাস্তিক হয়েছেন?

    এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি এমন এক যুক্তির জগৎ খুলে দেন, যা শুধু ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যাখ্যা নয়; বরং মানুষের চিন্তা, যুক্তি, ভয়, নৈতিকতা এবং স্বাধীনতার ধারণা নিয়েও গভীর প্রশ্ন তোলে। সেই লেখাই পরে পরিচিত হয় ‘হোয়াই আই অ্যাম অ্যান অ্যাথেইস্ট’ নামে।

    সাচ্চা বিপ্লবীর জীবন যেমনটা হওয়া উচিত, শহিদ-এ-আজ়ম ভগৎ সিং-এর জীবন ছিল ঠিক সেরকম।

    ভগত সিংয়ের নাস্তিকতার গল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, তিনি জন্মগত নাস্তিক ছিলেন না। বরং তার শৈশব কেটেছে ধর্মীয় পরিবেশে। পরিবারে ধর্মের প্রভাব ছিল প্রবল। তার ঠাকুরদা আর্য সমাজের অনুসারী ছিলেন এবং সেই পরিবেশের প্রভাব ভগত সিংয়ের ওপরও পড়েছিল।

    শৈশবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে তার কোনো সংশয় ছিল না। পরিবারে যা শিখেছেন, সেটিই বিশ্বাস করেছেন। লাহোরের ডিএভি স্কুলে পড়ার সময় হোস্টেলে থেকেছেন, নিয়মিত প্রার্থনা করেছেন এবং গায়ত্রী মন্ত্র জপ করেছেন। অর্থাৎ যে তরুণকে পরবর্তীতে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম আলোচিত নাস্তিক বিপ্লবী হিসেবে দেখা হবে, তার শুরুটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গা থেকে।

    তাহলে পরিবর্তনটা হলো কোথায়?

    পরিবর্তন শুরু হয় যখন ভগত সিং শুধু বিশ্বাস করার বদলে প্রশ্ন করতে শুরু করেন।

    ব্রিটিশ শাসনের অত্যাচার, দেশের পরাধীনতা, মানুষের দুর্দশা এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম তাকে যেমন নাড়া দিয়েছিল, তেমনি ব্যাপক পড়াশোনাও তার চিন্তার জগৎ বদলে দেয়। ইতিহাস, রাজনীতি, বিপ্লব, দর্শন ও সমাজতত্ত্বের নানা বই পড়তে পড়তে তিনি বুঝতে শুরু করেন- কোনো ধারণা শুধু পুরোনো বলে সত্য হয়ে যায় না। কোটি মানুষ বিশ্বাস করলেই সেটি প্রমাণিত হয় না। প্রশ্ন করতে হয়।

    আর এখানেই ভগত সিংয়ের চিন্তার সবচেয়ে বড় বাঁক।

    তিনি যেন নিজের বিশ্বাসকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন।

    ছোটবেলা থেকে যে ঈশ্বরে বিশ্বাস করে এসেছেন, তাকেই প্রশ্ন করলেন- আমি কি সত্যিই ঈশ্বরে বিশ্বাস করি? নাকি শুধু আমাকে বিশ্বাস করতে শেখানো হয়েছে বলেই বিশ্বাস করি?

    প্রশ্নটি যত সহজ, এর উত্তর তত কঠিন।

    কারণ মানুষের বিশ্বাস শুধু একটি ধারণা নয়। পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি ও শৈশবের শিক্ষা মিলিয়ে বিশ্বাস অনেক সময় মানুষের পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। সেই পরিচয়কে প্রশ্ন করা মানে নিজের ভেতরেই এক ধরনের সংঘাত তৈরি করা। ভগত সিং সেই সংঘাত থেকে পালাননি।

    তিনি বরং আরও পড়েছেন, আরও ভেবেছেন এবং নিজের পুরোনো বিশ্বাসকে আরও কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি করেছেন।

    তার নাস্তিকতার পেছনে তাই ব্যক্তিগত রাগ বা ধর্মের প্রতি ঘৃণার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যুক্তি ও স্বাধীন চিন্তা। তিনি বিপ্লবী হয়েছেন বলেই নাস্তিক হননি। তার অনেক সহযোদ্ধাই ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন। কেউ কেউ ছিলেন গভীরভাবে ধর্মপ্রাণও।

    অর্থাৎ তার কাছে বিপ্লব এবং নাস্তিকতা এক জিনিস ছিল না।

    বরং বিপ্লবী জীবন তাকে আরও স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মতো শক্তিশালী একটি ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার সাহস যদি একজন মানুষের থাকতে পারে, তাহলে নিজের বিশ্বাসকেও প্রশ্ন করার সাহস তার থাকা উচিত- এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ।

    এখানে ভগত সিংয়ের চিন্তার একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি কোনো ধারণাকে শুধু বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করতে চাননি। তার কাছে যুক্তি ছিল মূল বিষয়।

    কোনো বিশ্বাস হাজার বছরের পুরোনো হলেই সত্য নয়। কোটি কোটি মানুষ বিশ্বাস করলেই সত্য নয়। কোনো ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে বলেই কোনো বক্তব্যকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা যাবে না। সত্য হলে সেটি প্রশ্ন ও যুক্তির পরীক্ষায় টিকে থাকার ক্ষমতা রাখবে- এমনটাই ছিল তার চিন্তার ভিত্তি।

    এই জায়গা থেকেই তার নাস্তিকতা ধীরে ধীরে একটি দার্শনিক অবস্থানে পরিণত হয়।

    ভগত সিংয়ের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল স্বাধীন চিন্তা। তিনি মনে করতেন, একজন বিপ্লবী শুধু শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে না; তাকে নিজের চিন্তার ভেতরেও প্রশ্ন করার সাহস রাখতে হবে।

    কারণ যে মানুষ নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে ভয় পায়, সে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলবে?

    আর এই প্রশ্নটিই ভগত সিংয়ের নাস্তিকতাকে কেবল ধর্মবিশ্বাসের বিতর্ক থেকে বের করে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও মানবিক আলোচনায় নিয়ে যায়।

    তবে তার নাস্তিকতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা আসে কারাগারে।

    বাইরে থাকলে কোনো মানুষ নিজের বিশ্বাস নিয়ে তর্ক করতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একই অবস্থানে থাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার।

    ভগত সিং জানতেন, তার সামনে ফাঁসির দড়ি অপেক্ষা করছে। এমন অবস্থায় একজন বিশ্বাসীর কাছে প্রার্থনা হতে পারে আশ্রয়। ঈশ্বরের কাছে সাহায্য চাওয়া হতে পারে মানসিক শক্তির উৎস। কিন্তু ভগত সিংয়ের প্রশ্ন ছিল- আমি যদি সত্যিই ঈশ্বরে বিশ্বাস না করি, তাহলে শুধু মৃত্যুভয়ে শেষ মুহূর্তে তার কাছে প্রার্থনা করব কেন?

    এখানেই তার অবস্থান সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে।

    তিনি মৃত্যুর ভয়কে অস্বীকার করেননি। তিনি নিজেকে অতিমানব হিসেবেও দেখেননি। বরং একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে নিজের দুর্বলতা ও ভয়কে স্বীকার করেই বলেছিলেন- ভয় আমাকে আমার বিশ্বাস বদলাতে বাধ্য করবে না।

    অর্থাৎ তার নাস্তিকতার প্রকৃত পরীক্ষা ছিল আরাম নয়, মৃত্যুভয়।

    এই জায়গায় তার যুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। একজন মানুষ যদি ঈশ্বরে বিশ্বাস না করেও নৈতিক জীবনযাপন করতে পারে, তাহলে নৈতিকতার জন্য ঈশ্বরের ধারণা কি অপরিহার্য?

    ভগত সিংয়ের জীবন যেন এই প্রশ্নের বাস্তব উত্তর হয়ে দাঁড়ায়।

    তিনি স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন। কারাগারে গেছেন। নির্যাতন সহ্য করেছেন। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এর বিনিময়ে স্বর্গের পুরস্কার পাওয়ার কোনো প্রত্যাশা তার ছিল না।

    তাহলে তিনি কেন লড়লেন?

    কারণ তার কাছে ন্যায়সঙ্গত কাজ করার জন্য পরকালের পুরস্কারের প্রয়োজন ছিল না।

    এই ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর অর্থ দাঁড়ায়- মানুষ ভালো কাজ করবে শুধু ঈশ্বরের ভয় বা স্বর্গের লোভে নয়; মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেও ভালো কাজ করা সম্ভব।

    ভগত সিংয়ের কাছে একজন বিপ্লবীর আত্মত্যাগের মূল্য তার পরকালের পুরস্কারে নয়, বরং সে যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, তার মধ্যেই।

    এবার আসে আরও কঠিন প্রশ্ন-
    পৃথিবীতে এত দুঃখ কেন?

    যদি ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ ও সর্বদয় হন, তাহলে পৃথিবীতে এত অন্যায়, ক্ষুধা, শোষণ ও নিরপরাধ মানুষের কষ্ট কেন? কেন একজন শিশু দারিদ্র্যে জন্মাবে আর আরেকজন জন্ম থেকেই সুযোগ-সুবিধা পাবে? কেন একজন নিরপরাধ মানুষ অত্যাচারের শিকার হবে?

    ধর্মীয় ব্যাখ্যায় এসব প্রশ্নের বিভিন্ন উত্তর রয়েছে। কেউ বলেন কর্মফল, কেউ বলেন ঈশ্বরের পরিকল্পনা, কেউ বলেন মানুষের বোধের বাইরে রয়েছে সৃষ্টির রহস্য।

    কিন্তু ভগত সিং এসব ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি।

    বিশেষ করে কর্মফলের ধারণা তাকে ভাবিয়েছিল। একজন মানুষ যদি পূর্বজন্মের কোনো কাজের জন্য এই জীবনে শাস্তি পায়, অথচ সেই পূর্বজন্মের কথা তার মনে নেই, তাহলে সেই শাস্তির উদ্দেশ্য কী? তাকে সংশোধনের সুযোগই বা কোথায়?

    তার প্রশ্ন ছিল- যে অন্যায় মানুষ বুঝতেই পারছে না, সেই অন্যায়ের জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া হলে সেটিকে ন্যায় বলা যায় কীভাবে?

    এখানে ভগত সিং কোনো চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক উত্তর দেওয়ার দাবি করেননি। বরং তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন। আর তার চিন্তার সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই- তিনি উত্তর না জানাকে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু অজানার জায়গায় সহজে একটি অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা বসাতে রাজি ছিলেন না।

    অর্থাৎ ‘আমি জানি না’ তার কাছে ‘তাই নিশ্চয়ই ঈশ্বর’- এই যুক্তির চেয়ে বেশি সৎ ছিল।

    এটি তার নাস্তিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

    তিনি ধর্মবিশ্বাসী মানুষের অনুভূতিকেও অস্বীকার করেননি। একজন মানুষ বিপদের সময় ঈশ্বরে বিশ্বাস করে সান্ত্বনা পেতে পারেন। একাকিত্বে প্রার্থনা তাকে শক্তি দিতে পারে। কিন্তু কোনো বিশ্বাস একজন মানুষকে মানসিক শান্তি দেয়- এটি সেই বিশ্বাস সত্য হওয়ার প্রমাণ নয়।

    ভগত সিংয়ের যুক্তি ছিল মূলত এখানেই।

    সান্ত্বনা আর সত্য এক জিনিস নয়।

    মানুষ কোনো কিছু বিশ্বাস করতে চায় বলেই সেটি সত্য হয়ে যায় না। সত্যকে আলাদা করে যাচাই করতে হবে।

    এই চিন্তা থেকেই তার নাস্তিকতা আসলে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সততার অবস্থান হয়ে ওঠে। তিনি এমন কিছু বিশ্বাস করতে চাননি যা তার নিজের বুদ্ধি মেনে নিতে পারছে না- শুধু ভয়, অভ্যাস বা সামাজিক চাপের কারণে।

    আর এখানেই ‘অহংকারের কারণে নাস্তিক’- এই অভিযোগের জবাবও তিনি দেন।

    তিনি স্বীকার করেছিলেন, মানুষের মধ্যে অহংকার থাকতে পারে। তার মধ্যেও থাকতে পারে। কিন্তু যদি অহংকারই তার নাস্তিকতার কারণ হতো, তাহলে তাকে নিজেকে ঈশ্বরের সমকক্ষ ভাবতে হতো। অথচ তিনি নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই দেখতেন।

    তার যুক্তি ছিল, ঈশ্বরকে অস্বীকার করা মানে নিজেকে ঈশ্বর মনে করা নয়।

    বরং তিনি নিজের সীমাবদ্ধতাও স্বীকার করতেন। মানুষ ভুল করতে পারে, মানুষ সবকিছু জানে না এবং মানুষের জ্ঞান অসম্পূর্ণ- এই স্বীকারোক্তি তার চিন্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল না।

    বরং এখানেই তার আরেকটি বড় শিক্ষা- সন্দেহ মানেই দুর্বলতা নয়।

    কখনো কখনো সন্দেহই জ্ঞান অর্জনের প্রথম ধাপ।

    যে মানুষ প্রশ্ন করে, সে ভুলও করতে পারে। কিন্তু যে মানুষ প্রশ্নই করে না, তার ভুল সংশোধনের সুযোগও থাকে না।

    ভগত সিংয়ের বিপ্লবী চিন্তায় তাই বই ছিল অস্ত্রের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তার কাছে বোমা বা পিস্তল দিয়ে একটি জীবন শেষ করা যায়, কিন্তু চিন্তা একটি সমাজকে বদলে দিতে পারে।

    এই কারণেই তিনি পড়াশোনাকে এত গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু আবেগ দিয়ে বিপ্লব হয় না। শুধু সাহস থাকলেই একজন মানুষ পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারে না। প্রয়োজন জ্ঞান, যুক্তি, ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা এবং নিজের অবস্থানকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা।

    একজন রোমান্টিক বিপ্লবী থেকে একজন চিন্তাশীল বিপ্লবীতে তার যে পরিবর্তন, নাস্তিকতার পথটিও সেই পরিবর্তনের অংশ।

    প্রথমদিকে তার মধ্যে ছিল দেশপ্রেম, আবেগ, ক্ষোভ ও বিপ্লবের স্বপ্ন। পরে সেই আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয় দর্শন ও যুক্তিবাদ। তিনি বুঝতে পারেন, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করাই যথেষ্ট নয়; মানুষ কেন শোষিত হয়, সমাজ কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ কেমন হতে পারে- এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে।

    এ কারণে ভগত সিংয়ের নাস্তিকতা শুধু ‘ঈশ্বর আছেন কি নেই’- এই প্রশ্নে আটকে থাকে না।

    এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও বড় একটি প্রশ্ন-
    মানুষ কি নিজের ভাগ্যের দায়িত্ব নিজে নিতে পারে?

    ভগত সিংয়ের উত্তর ছিল- পারা উচিত।

    অন্যায় হলে ঈশ্বর এসে পরিবর্তন করবেন- এই অপেক্ষায় বসে থাকার বদলে মানুষকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। দারিদ্র্য দূর করতে মানুষকেই ব্যবস্থা বদলাতে হবে। শোষণের বিরুদ্ধে মানুষকেই লড়তে হবে। স্বাধীনতা চাইলে মানুষকেই তার মূল্য দিতে হবে।

    এখানেই তার নাস্তিকতা রাজনৈতিক অর্থও পেয়ে যায়।

    তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মুক্তি কোনো অলৌকিক শক্তির ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। মুক্তির দায়িত্ব মানুষেরই।

    তবে সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো- এই দর্শন তিনি বেছে নিয়েছিলেন এমন সময়ে, যখন তার নিজের জীবনের কোনো নিরাপত্তা ছিল না।

    তিনি জানতেন, কয়েক দিনের মধ্যে বা কয়েক মাসের মধ্যে তার মৃত্যু হতে পারে। তবুও মৃত্যুভয়ে নিজের চিন্তা বদলাননি।

    কারণ তার কাছে সত্যের মূল্য জীবনের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল।

    এই জায়গায় ভগত সিংকে শুধু একজন নাস্তিক হিসেবে দেখলে তার চিন্তার ব্যাপ্তি কমিয়ে দেখা হয়। তিনি মূলত প্রশ্ন করার স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।

    ঈশ্বরকে বিশ্বাস করবেন কি না- সেটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু কেন বিশ্বাস করবেন, কেন করবেন না, সেই প্রশ্ন করার অধিকারকে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন।

    তার চিন্তার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক সম্ভবত এটিই- তিনি মানুষকে তার নিজের বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছিলেন।

    কারণ অন্যের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা সহজ। নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা কঠিন।

    ভগত সিং সেই কঠিন কাজটিই করেছিলেন।

    শৈশবের ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে শুরু করে বিপ্লবী রাজনীতি, দর্শন ও যুক্তির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি এমন একটি অবস্থানে পৌঁছান, যেখানে মৃত্যুভয়ও তাকে নিজের চিন্তার সঙ্গে আপস করাতে পারেনি।

    ১৯৩১ সালের মার্চে ভগত সিং, সুখদেব ও রাজগুরুকে ফাঁসি দেওয়া হয়। বয়স তখন মাত্র ২৩।

    তার হাতে তখন আর কোনো অস্ত্র ছিল না। সামনে ছিল ফাঁসির দড়ি। কিন্তু তার চিন্তা তখনও স্বাধীন।

    আর সম্ভবত এখানেই ভগত সিংয়ের নাস্তিকতার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য।

    তিনি শুধু ঈশ্বরকে অস্বীকার করেননি; তিনি অন্ধভাবে কিছু মেনে নেওয়ার ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন- মানুষের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা শুধু শাসকের হাত থেকে মুক্তি নয়, নিজের চিন্তার ওপরও স্বাধীন অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

    ভগত সিংয়ের নাস্তিকতার গল্প তাই শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরকে নিয়ে যতটা, তার চেয়েও বেশি মানুষকে নিয়ে।

    একজন মানুষ কীভাবে নিজের শৈশবের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে পারে, কীভাবে জনপ্রিয় ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে, কীভাবে ‘আমি জানি না’ বলতে ভয় না পেয়ে সত্যের অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে পারে এবং কীভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নিজের বিবেকের সঙ্গে আপস না করতে পারে- তার জীবনের এই অধ্যায় সেই প্রশ্নগুলোরই এক কঠিন উদাহরণ।

    ফাঁসির দড়ি তার জীবন থামিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু যে প্রশ্ন তিনি রেখে গিয়েছিলেন, সেটি থামেনি- আমরা যা বিশ্বাস করি, তা কি সত্যিই আমাদের নিজের চিন্তা থেকে বিশ্বাস করি, নাকি শুধু বিশ্বাস করতে শেখানো হয়েছে বলেই বিশ্বাস করি?

    সম্ভবত ভগত সিংয়ের নাস্তিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই- ঈশ্বরে বিশ্বাস করবেন কি করবেন না, তার আগে অন্তত নিজের বিশ্বাসকে একবার প্রশ্ন করার সাহস আছে কি না।

    Share. Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    সম্পর্কিত সংবাদ

    ভূ-রাজনীতি

    মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের কী লাভ, কী ঝুঁকি?

    আগস্ট 28, 2026
    আন্তর্জাতিক

    যুক্তরাষ্ট্র থেকে ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী জ্যাভলিন ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে ভারত

    আগস্ট 28, 2026
    মতামত

    শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনে অস্ট্রেলিয়ার মডেল থেকে কী শিখতে পারে বাংলাদেশ?

    আগস্ট 28, 2026
    একটি মন্তব্য করুন Cancel Reply

    সর্বাধিক পঠিত

    মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের কী লাভ, কী ঝুঁকি?

    ভূ-রাজনীতি আগস্ট 28, 2026

    ইস্পাত শিল্প তীব্র সংকটে উৎপাদন বন্ধের পথে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    আইএমএফের রিপোর্টে ঋণের নতুন রেকর্ড পৌছালো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    নতুন বাণিজ্য কৌশলে আরসেপে যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024
    সংযুক্ত থাকুন
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • YouTube
    • Telegram

    EMAIL US

    contact@citizensvoicebd.com

    FOLLOW US

    Facebook YouTube X (Twitter) LinkedIn
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement

    WhatsApp

    01339-517418

    Copyright © 2026 Citizens Voice All rights reserved

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.