বাংলাদেশ ব্যাংকের চাপিয়ে দেওয়া নিয়মের অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই পরিচালনা পর্ষদের কাঠামো বদলাতে শুরু করেছে দুটি বেসরকারি ব্যাংক। এনসিসি ব্যাংক চেয়ারম্যান পদে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পালাক্রমে দায়িত্ব দেওয়ার নিয়ম করেছে। আর এসবিএসি ব্যাংক একজন স্বতন্ত্র পরিচালককে চেয়ারম্যান করেছে। দুই ব্যাংকেরই লক্ষ্য একই: পর্ষদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কমিয়ে সুশাসন নিশ্চিত করা।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে ব্যাংক খাত সংস্কারের চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অনিয়ম ঠেকাতে একের পর এক নীতিমালা জারি হয়েছে। পরিচালকদের যোগ্যতা, দায়িত্ব ও কর্তব্য স্পষ্ট করা হয়েছে। সর্বশেষ ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাজ মূল্যায়নের জন্য ১০০ নম্বরের একটি কাঠামো ঠিক করা হয়েছে। এক ডজনের বেশি ব্যাংকের পর্ষদে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বতন্ত্র পরিচালক ও পর্যবেক্ষক বসিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কিছু ব্যাংক এখন নিজেরাও পদক্ষেপ নিচ্ছে।
পর্ষদের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে ব্যাংকের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। তখন আমানতকারী ও গ্রাহকের আস্থায় ঘাটতি তৈরি হয়। অতীতে এমন কোন্দলের কারণে কিছু ব্যাংক সংকটে পড়েছে। ভবিষ্যতে সেই ঝুঁকি এড়াতেই এই নতুন ব্যবস্থা।
এনসিসি ব্যাংকের নতুন নিয়ম: ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক (এনসিসি) সম্প্রতি ১২তম বিশেষ সাধারণ সভা করেছে। সেখানে সংঘবিধি সংশোধন করে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচনের নিয়ম বদলানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দিলে আগামী অক্টোবর থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর হবে।
নতুন ব্যবস্থার মূল বিষয়গুলো এমন:
- সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্বে থাকা শেয়ারধারী পরিচালক পালাক্রমে চেয়ারম্যান হবেন।
- মেয়াদ শেষ হলে বা পদ খালি হলে পরবর্তী জ্যেষ্ঠতম পরিচালক দায়িত্ব পাবেন।
- দুজনের জ্যেষ্ঠতা সমান হলে বয়সে বড়জন এগিয়ে থাকবেন।
- জ্যেষ্ঠতম পরিচালক লিখিতভাবে অনিচ্ছা জানালে পরের জন সুযোগ পাবেন।
- কেউ নিজের পালায় চেয়ারম্যান না হলেও পরিচালক হিসেবে থাকতে পারবেন। তবে তিনি চেয়ারম্যান হতে পারবেন সব পরিচালকের পালা শেষ হওয়ার পর।
- নতুন ও মনোনীত পরিচালকদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। তাঁদের জ্যেষ্ঠতা গণনা হবে পর্ষদে যোগ দেওয়ার তারিখ থেকে।
- সাবেক পরিচালক আবার পর্ষদে ফিরলে তিনি নতুন পরিচালক হিসেবে গণ্য হবেন।
- চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় কারও পর্যায়ক্রমিক অবসরের সময় এলে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতিতে আবার নির্বাচিত হলে তিনি নিজের মেয়াদ পূর্ণ করবেন।
চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালনে শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম হলে কিংবা তাঁর কাজে ব্যাংকের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে হলে আলাদা ব্যবস্থা আছে। তাঁকে প্রথমে আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তিসংগত সুযোগ দেওয়া হবে। এরপর পর্ষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য একমত হলে তাঁকে অপসারণ করা যাবে। খালি পদ পূরণ হবে জ্যেষ্ঠতার নিয়মেই।
এনসিসি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুন নেওয়াজ সেলিম জানান, চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অনেকে পদের জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এতে পরিচালকদের সম্পর্কের অবনতি হয়। এ কারণে ২০২৫ সালে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে চেয়ারম্যান করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশে তা এগোয়নি। এবার নতুন করে উদ্যোগ নিয়ে ব্যাংকের সব পর্যায়ের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। এখন শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন বাকি।
তাঁর ভাষ্য, নতুন নিয়ম চালু হলে নেতৃত্ব নিয়ে আর অসম প্রতিযোগিতা থাকবে না। সবাই ব্যাংকের উন্নতিতে মনোযোগ দিতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মে চেয়ারম্যানের মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই বছর। এনসিসি ব্যাংক এই দুই বছরের মেয়াদই রাখতে চায়। অন্যদিকে যমুনা ব্যাংক অনেক আগে থেকেই প্রতিবছর চেয়ারম্যান বদলের ধারা অনুসরণ করছে। ব্যাংকটির দাবি, এতে ভাবমূর্তি ও আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। যমুনা ব্যাংক এখন শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তির ব্যাংক হিসেবে পরিচিত এবং খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের নিচে নামিয়েছে। এনসিসি ব্যাংকেও খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের নিচে।
এসবিএসি ব্যাংকের ভিন্ন পথ: নতুন প্রজন্মের ব্যাংক এসবিএসি নিয়েছে আরও ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। পর্ষদের শেয়ারধারী পরিচালকেরা একজন স্বতন্ত্র পরিচালককে চেয়ারম্যান করেছেন। বর্তমানে সংকটে থাকা কিছু ব্যাংক ছাড়া দেশের আর কোনো ব্যাংকে স্বতন্ত্র পরিচালক চেয়ারম্যান নেই। তবে সেসব ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ আছে। এসবিএসির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি পর্ষদ নিজেই নিয়েছে।
জানা গেছে, ব্যাংকটির বেশির ভাগ পরিচালক ব্যবসায়ী। তাঁরা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন। যাঁরা আগ্রহী, তাঁদের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাই কোনো শেয়ারধারী পরিচালকের নামে ঐকমত্য হয়নি।
এই অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মাকছুদুর রহমান সরকারকে এক বছরের জন্য চেয়ারম্যান করা হয়েছে। তিনি ব্যাংকটির স্বতন্ত্র পরিচালকও।
মাকছুদুর রহমান সরকার বলেন, আগের পদ্ধতি যে ব্যর্থ হয়েছে, তা প্রমাণিত। এর ফলে অর্থনীতি, রাজনীতি ও ব্যাংক খাতে নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শেয়ারধারী পরিচালকেরা পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব করেছেন। তাই সবাই মিলে তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছেন। আগের স্বতন্ত্র পরিচালকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করেননি। তিনি নতুন একটি ধারা তৈরির সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন, যাতে অন্য ব্যাংকও তা অনুসরণ করতে পারে।
বিশ্লেষণ: এই পরিবর্তনের তাৎপর্য- প্রথমত, উদ্যোগটি ভেতর থেকে এসেছে। এতদিন সংস্কারের বেশির ভাগ চাপ এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিক থেকে। এখন ব্যাংকের মালিক-পরিচালকেরা নিজেরাই বুঝতে শুরু করেছেন, পর্ষদের দ্বন্দ্ব ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর। ভেতর থেকে আসা সংস্কার সাধারণত টেকসই হয়।
দ্বিতীয়ত, দুই ব্যাংকের দুই আলাদা সমাধান। এনসিসি বেছে নিয়েছে পূর্বনির্ধারিত নিয়ম। এতে ক্ষমতার লড়াইয়ের জায়গা কমে। এসবিএসি বেছে নিয়েছে নিরপেক্ষ বাইরের একজনকে। এতে শেয়ারধারীদের স্বার্থের সংঘাত কমার সুযোগ থাকে। কোন পথ বেশি কার্যকর, তা সময়ই বলে দেবে।
তৃতীয়ত, জ্যেষ্ঠতার নিয়মের সীমাবদ্ধতাও আছে। জ্যেষ্ঠতা মানেই যোগ্যতা নয়। সবাই পালাক্রমে চেয়ারম্যান হলে নেতৃত্বের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে অক্ষমতা বা স্বার্থহানির ক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অপসারণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা এই ঝুঁকি কিছুটা সামলাবে।
চতুর্থত, স্বতন্ত্র পরিচালকের চেয়ারম্যান হওয়ার ঝুঁকি ও সম্ভাবনা। সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান নিজেই স্বীকার করেছেন, আগের স্বতন্ত্র পরিচালকেরা দায়িত্ব পালন করেননি। এখন এসবিএসির উদাহরণ সফল হলে অন্য ব্যাংকও এই পথে হাঁটতে পারে। ব্যর্থ হলে বিষয়টি বিপরীত বার্তা দেবে। এক বছরের মেয়াদ হওয়ায় ফলাফল দ্রুত মূল্যায়ন করা যাবে।
পঞ্চমত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা এখনো নির্ধারক। এনসিসির নতুন নিয়ম কার্যকর হতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন লাগবে। অনুমোদন মিললে এটি অন্য ব্যাংকের জন্যও একটি নজির হতে পারে। না মিললে উদ্যোগ আবার আটকে যাবে।
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: যমুনা ব্যাংকের ভালো অবস্থানের পেছনে শুধু চেয়ারম্যান বদলই একমাত্র কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। খেলাপি ঋণ কমার পেছনে আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। সব মিলিয়ে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কারের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর নিজস্ব উদ্যোগ খাতটির জন্য ইতিবাচক লক্ষণ। এখন দেখার বিষয়, এই নতুন কাঠামো বাস্তবে কতটা সুশাসন ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।

