জাতিসংঘের কাঠামোয় “কিলার রোবট” নিয়ন্ত্রণের আলোচনা পৌঁছেছে সিদ্ধান্তের মুহূর্তে; কূটনীতিকদের সামনে এখন শুধু “হ্যাঁ বা না”-এর প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন এখন বহুপাক্ষিক জটিল
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রাণঘাতী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থা (Lethal Autonomous Weapons Systems বা AWS) নিয়ন্ত্রণের আলোচনা এ বছর একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের প্রচলিত অস্ত্র কনভেনশন (CCW)-এর অধীনে গঠিত বিশেষজ্ঞ দল (GGE) তাদের তিন বছরের কার্যকাল শেষ করছে ৩১ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে। এই দলের চূড়ান্ত প্রতিবেদন নভেম্বরে CCW-এর সপ্তম পর্যালোচনা সম্মেলনে জমা দেওয়া হবে, যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে তাদের সামনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আলোচনা যতটা সরল মনে হয়, ততটা নয়
স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর গবেষক নেত্তা গুসাক তাঁর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলছেন, জনসমক্ষে বিতর্কটি প্রায়ই সীমাবদ্ধ থাকে একটি প্রশ্নে—রাষ্ট্রগুলো কি একটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করবে, নাকি করবে না? কিন্তু বাস্তবে কূটনীতিকদের ভাবনা আরও বিস্তৃত। রাষ্ট্র প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎকার এবং সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাঁরা বিবেচনা করছেন—সম্ভাব্য নীতির পরিধি, বাস্তব প্রভাব, সময়োপযোগিতা, বিদ্যমান আইনি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য, একক চুক্তির নাকি ধাপে ধাপে অগ্রগতি, ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং যেকোনো ফলাফলের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা।
গবেষণা অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্র বাধ্যতামূলক চুক্তির সময় নিয়ে দ্বিধায় থাকলেই তার মানে এই নয় যে তারা এর বিষয়বস্তুর বিরোধী। আবার যে রাষ্ট্র চুক্তির পক্ষে সোচ্চার, সেও হয়তো মনে করে—চুক্তির পাশাপাশি ব্যাখ্যামূলক নির্দেশনা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা এবং সামরিক বাহিনীর জন্য বাস্তবসম্মত নির্দেশিকারও প্রয়োজন আছে। এই সূক্ষ্ম অবস্থানগুলো প্রায়ই কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে প্রকাশ্যে বলা হয় না, ফলে বাইরে থেকে বিতর্কটিকে যতটা মেরুকৃত মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়।
যতটা ধীরগতি, ততটা মতবিরোধ নেই
প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, আলোচনার ধীরগতি সত্ত্বেও রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মিলের জায়গা আসলে অনেক বড়। অধিকাংশ রাষ্ট্রই একমত যে—CCW-ই এই ইস্যুর জন্য উপযুক্ত মঞ্চ; একটি “দ্বি-স্তর” পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য, যেখানে কিছু ধরনের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে, আর বাকিগুলো নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধতার আওতায় আসবে; এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনই (International Humanitarian Law) এক্ষেত্রে মূল আইনি ভিত্তি হওয়া উচিত।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহও এই মিলের প্রমাণ দেয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত GGE অধিবেশনে ব্রাজিল ৪২টি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি যৌথ বিবৃতি দেয়, যেখানে চেয়ারের প্রস্তাবিত খসড়া পাঠ্যের ভিত্তিতে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানানো হয়। ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০-এরও বেশিতে, যা CCW-র মোট সদস্য রাষ্ট্রের অর্ধেকের বেশি। এছাড়া, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত একটি প্রস্তাব—যা CCW সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ভবিষ্যৎ আলোচনার লক্ষ্যে একটি কাঠামোর মূল উপাদান তৈরির আহ্বান জানায়—তা সমর্থন পায় ১৫৬টি রাষ্ট্রের।
গবেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে ধীরগতির মূল কারণ বিষয়বস্তুতে মতবিরোধ নয়, বরং রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও নেতৃত্বের ঘাটতি—যার পেছনে রয়েছে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ।
সামরিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সংযোগ
স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থা এবং আরও বিস্তৃত পরিসরের সামরিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Military AI) সাধারণত পৃথক বিষয় হিসেবে, পৃথক মঞ্চে আলোচিত হয়ে থাকে। AWS নিয়ে মূল আলোচনা হয় CCW-তে, আর সামরিক AI নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রথম কমিটি, সামরিক ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল AI বিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন (REAIM), এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি রাজনৈতিক ঘোষণার মতো মঞ্চে। কিন্তু বাস্তবে দুটি আলোচনার মূল উদ্বেগ—বল প্রয়োগের সিদ্ধান্তে মানুষের ভূমিকা, অ্যালগরিদমের পক্ষপাত ও নির্ভরযোগ্যতা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা—একে অপরের সঙ্গে ব্যাপকভাবে জড়িত।
গবেষকরা সতর্ক করছেন, দুটি আলোচনা সমান্তরালভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় অসামঞ্জস্য বা ফাঁকফোকর তৈরি হতে পারে। তাই তাঁদের পরামর্শ, GGE, প্রথম কমিটি, REAIM এবং জাতিসংঘ নিরস্ত্রীকরণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীনে ২০২৬ সালের জুনে চালু হওয়া “AI, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক উৎকর্ষ কেন্দ্র”-এর মতো মঞ্চগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শিক্ষা বিনিময় হওয়া দরকার।
২০২৬ সাল রাষ্ট্রগুলোর কাছে কী চাইছে
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়ে আসছে—উদ্বেগগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার জটিলতা, বহুপাক্ষিক প্রক্রিয়ার অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতা এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থার ঘাটতির কারণে। তবে গবেষকদের মতে, এ বছরের সিদ্ধান্তগুলো শুধু এই অস্ত্র ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণকেই নয়, বরং সামরিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সামগ্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকেও প্রভাবিত করবে।
তাই GGE-র আসন্ন অধিবেশন, ২০২৬ সালের প্রথম কমিটির বৈঠক এবং CCW পর্যালোচনা সম্মেলনের প্রস্তুতিতে থাকা প্রতিনিধিদলগুলোর সামনে প্রকৃত প্রশ্নটি হলো—শুধু একটি বাধ্যতামূলক চুক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়, বরং বাধ্যতামূলক ও অ-বাধ্যতামূলক, বিষয়বস্তুভিত্তিক ও প্রক্রিয়াগত—এমন নানা পদক্ষেপের কোন সমন্বয়কে তারা সমর্থন করবে, এবং তা সামরিক AI নিয়ে সমান্তরাল আলোচনার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবে।

