পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু: বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক নিদারুণ সতর্কবার্তা
সারাদিন অন্যের দুঃখের খবর করেন যিনি, কেউ চাকরি হারালে তিনি ছুটে যান, কেউ বঞ্চিত হলে তার কণ্ঠ হয়ে ওঠেন, কেউ অন্যায়ের শিকার হলে তার পক্ষে দাঁড়ান। কিন্তু দিন শেষে সেই সাংবাদিক যখন নিজের ঘরে ফেরেন, তখন তাঁর নিজের গল্পটি কে শোনে?
এই প্রশ্নটিই যেন আরও একবার নির্মমভাবে সত্য হয়ে উঠল বরিশালের প্রবীণ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুতে। দীর্ঘদিন যুগান্তর ও সমকালে বরিশাল ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই সাংবাদিক, যিনি একসময় বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন, সমকালের বরিশাল কার্যালয় থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি সুইসাইড নোটও উদ্ধার করেছে। পরিবারের বরাতে জানা গেছে, ২০২৩ সালে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ কর্মহীনতা ও তার সঙ্গী হওয়া হতাশাই তাঁকে এই চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৭ বছর। তিনি স্ত্রী ও এক কন্যাসন্তান রেখে গেছেন।
একটি জীবনের পেছনে যে গল্প
পুলক চ্যাটার্জি কোনো নতুন মুখ ছিলেন না সাংবাদিকতায়। বরিশালের মতো একটি অঞ্চলে বছরের পর বছর সংবাদ সংগ্রহ করা, স্থানীয় দুর্নীতি-অনিয়ম তুলে ধরা, রাজনৈতিক চাপ সামলে নিরপেক্ষ প্রতিবেদন তৈরি করা, প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে থেকে সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো; এই দীর্ঘ পেশাগত জীবনের বিনিময়ে যে স্বীকৃতি বা নিরাপত্তা তাঁর প্রাপ্য ছিল, বাস্তবে তার কতটুকু তিনি পেয়েছিলেন?
২০২৩ সালে ব্যুরো প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর তিনি দীর্ঘদিন কর্মহীন ছিলেন। তবু সাবেক ব্যুরো প্রধান ও জ্যেষ্ঠ সংবাদকর্মী হিসেবে তিনি মাঝেমধ্যে সমকালের আঞ্চলিক কার্যালয়ে গিয়ে বসতেন, পত্রিকা পড়তেন; যেন সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর নাড়ির টান কিছুতেই ছিন্ন হচ্ছিল না। এই ছবিটি একই সঙ্গে করুণ এবং প্রতীকী। এক সময়ের বার্তা প্রধান, যিনি নিজের কলমে অন্যের অধিকারের কথা লিখতেন, শেষ পর্যন্ত নিজের প্রতিষ্ঠানের দরজায় একজন “প্রাক্তন” হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
একটি চাকরি হারানো মানে শুধু একটি সংখ্যা হারানো নয়
একজন সাংবাদিক মাস শেষে যে বেতন পান, সেটি তাঁর কাছে শুধুই একটি সংখ্যা নয়।
ওই টাকায় হয়তো সন্তানের স্কুলের বেতন দিতে হয়।
ওই টাকায় বাসাভাড়া দিতে হয়, সংসার চলে।
ওই টাকাতেই হয়তো একটি পরিবারের প্রতিদিনের স্বপ্ন বেঁচে থাকে।
তাই হঠাৎ চাকরি হারানো একজন মধ্যবয়সী, দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাংবাদিকের জন্য শুধু পেশাগত সমস্যা নয়, এটি একটি পরিবারের অস্তিত্বের সংকট। বয়স পঞ্চাশ পেরোনোর পর নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানে জায়গা করে নেওয়া, নতুন করে জীবিকা শুরু করা বাংলাদেশের গণমাধ্যম শিল্পের বাস্তবতায় তা কতটা সহজ? পুলক চ্যাটার্জির জীবনের শেষ কয়েক বছর যেন এই প্রশ্নেরই এক নীরব উত্তর।
যে পেশা অন্যের অধিকার নিয়ে লেখে, নিজের অধিকার নিয়ে নীরব থাকে
এখানেই সবচেয়ে নির্মম বৈপরীত্য। একজন সাংবাদিক প্রতিদিন মানুষের অধিকার নিয়ে লেখেন, বেতন-বঞ্চনা নিয়ে প্রতিবেদন করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেন কিন্তু তার নিজের প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একই অন্যায় ঘটলে অনেক সময় তিনি নিজেই কণ্ঠহীন হয়ে পড়েন। কারণ তিনি জানেন, প্রতিবাদের মূল্য হতে পারে তাঁর নিজের চাকরিটাই।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয় — এটি সাংবাদিকতার অভ্যন্তরীণ কাঠামোর সেই দীর্ঘদিনের নীরবতার দিকে তীব্রভাবে ইঙ্গিত করছে, যেখানে চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্য অবসর-ব্যবস্থা বা পুনর্বাসনের কোনো নিশ্চিত পথ অনেক সংবাদকর্মীর সামনে থাকে না।
সংকটের শিকড় কোথায়?
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এর পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত হয়ে আসছে।
- গণমাধ্যম শিল্পের আর্থিক অস্থিরতা।
- বিজ্ঞাপন-নির্ভরতার সংকট, শ্রম আইনের দুর্বল প্রয়োগ।
- ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন পরিকল্পনার অভাব।
- সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া দর কষাকষির সক্ষমতা।
এসব মিলিয়ে তৈরি হয় এমন এক বাস্তবতা, যেখানে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, প্রবীণ একজন সাংবাদিকও কোনো পূর্ব প্রস্তুতি বা নিরাপত্তা-বলয় ছাড়াই হঠাৎ পথে নেমে আসতে পারেন।
রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা কোথায়?
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা বলে সীমাবদ্ধ করে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের দীর্ঘদিনের এক নিষ্ক্রিয়তা, যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় বহু আগেই পেরিয়ে গেছে।
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ন্যূনতম বেতন-ভাতা নির্ধারণের জন্য “সাংবাদিক ওয়েজ বোর্ড” নামে একটি সরকারি কাঠামো আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এই ওয়েজ বোর্ডের সুপারিশ বাস্তবায়ন করে না, আর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও তা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করার মতো কঠোর তদারকি বা জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নেই। ফলে ওয়েজ বোর্ড কাগজে-কলমে থেকে যায়, বাস্তবে অসংখ্য সাংবাদিকের জীবনে তার কোনো প্রতিফলন ঘটে না।
শ্রম আইনে চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে যথাযথ নোটিশ, ক্ষতিপূরণ ও পাওনা পরিশোধের বিধান থাকলেও, সাংবাদিকতা পেশায় তার প্রয়োগ কতটা নিশ্চিত করা হয় তা নিয়ে বহুদিন ধরেই প্রশ্ন আছে। একজন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ, প্রবীণ সাংবাদিককে যখন কোনো সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসন পরিকল্পনা বা আর্থিক নিরাপত্তা ছাড়াই হঠাৎ পথে নামিয়ে দেওয়া হয়, তখন রাষ্ট্রের শ্রম অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কোথায় থাকে?
প্রেস কাউন্সিলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে সংবাদকর্মীদের পেশাগত ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে সুপারিশ তৈরি ও তা বাস্তবায়নে চাপ প্রয়োগের। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠান প্রায়ই নিষ্ক্রিয়, ক্ষমতাহীন বা রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে নয় বলে সমালোচনা রয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অনুপস্থিতি। সাংবাদিকদের জন্য কোনো কার্যকর বেকার ভাতা, স্বাস্থ্যবিমা বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় কাঠামো নেই। ফলে চাকরি হারানোর পর একজন সাংবাদিক শুধু আর্থিক সংকটেই পড়েন না, তিনি পড়েন এক ধরনের সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতায় যেখানে রাষ্ট্র তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রাখেনি।
গণমাধ্যম মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা তখনই লাগাম পায়, যখন রাষ্ট্র কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করে। কিন্তু বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে দেখা গেছে, সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম, বেতন বকেয়া বা অন্যায্য ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা তেমন একটা নেওয়া হয় না। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতিই ধীরে ধীরে পুলক চ্যাটার্জির মতো ঘটনার জমি তৈরি করে দেয়।
তাই প্রশ্নটি শুধু “গণমাধ্যম মালিক কী করলেন” তাতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রশ্ন তুলতে হবে – রাষ্ট্র কেন ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন নিশ্চিত করছে না? রাষ্ট্র কেন সাংবাদিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করছে না? রাষ্ট্র কেন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের আর্থিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর কাঠামো গড়ে তুলছে না? যতদিন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না মেলে, ততদিন পুলক চ্যাটার্জির গল্প কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়েই থেকে যাবে না তা বারবার ফিরে আসার আশঙ্কা থেকে যাবে।
তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কী?
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু বাংলাদেশের প্রতিটি সংবাদকর্মীর সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। আজ যে তরুণ সাংবাদিক নিউজরুমে বসে স্বপ্ন দেখছেন, দশ-বিশ বছর পর তাঁর অবস্থাও কি একই রকম অনিশ্চিত হয়ে উঠবে? অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠান যখন খোঁজে সস্তায় পাওয়া তরুণ কর্মী, তখন একজন প্রবীণ, অভিজ্ঞ সাংবাদিকের জায়গা কোথায় দাঁড়ায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা আজ আর বিলাসিতা নয় – এটি জরুরি একটি দায়িত্ব।
সাংবাদিককে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে সাংবাদিকতাকে
আমরা স্বাধীন গণমাধ্যম চাই। আমরা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা চাই। আমরা ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় দেখতে চাই। কিন্তু সেই সাংবাদিককেই যদি আমরা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে অসহায় করে রাখি, তাহলে তাঁর কাছ থেকে সাহসী ও দীর্ঘমেয়াদী সাংবাদিকতা কতদিন আশা করা যায়?
সাংবাদিকের ন্যায্য বেতন কোনো দয়া নয়। চাকরির নিরাপত্তা কোনো অনুগ্রহ নয়। ছাঁটাইয়ের পর মর্যাদাপূর্ণ বিদায় ও পুনর্বাসনের সুযোগ কোনো পুরস্কার নয় বরঞ্চ একজন কর্মজীবী মানুষের মৌলিক প্রাপ্য। গণমাধ্যম মালিকদের পাশাপাশি রাষ্ট্র, সাংবাদিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে সাংবাদিকদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও মানসিকভাবে সহায়ক পেশাগত পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেন চাকরিচ্যুতি কখনো কারো জীবনের শেষ প্রান্ত হয়ে না দাঁড়ায়।
একজন সাংবাদিক যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন “আমি অমুক স্থান থেকে বলছি…” তখন আমরা তাঁর কণ্ঠ শুনি। কিন্তু ক্যামেরা বন্ধ হওয়ার পর, প্রতিষ্ঠানের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, সেই মানুষটির জীবনে কী অপেক্ষা করছে তা আমরা অনেক সময় দেখি না, জানতে চাই না।
পুলক চ্যাটার্জির চলে যাওয়া আমাদের সেই না-দেখা বাস্তবতার সামনে আবার দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। *যাঁরা প্রতিদিন সমাজের আয়না তুলে ধরেন, তাঁদের নিজের জীবন যেন সেই আয়নার পেছনে অন্ধকার হয়ে না থাকে* এই শিক্ষাটুকু অন্তত এই মৃত্যু থেকে আমাদের নেওয়া উচিত।
মিজান মাজনুন
সাংবাদিক ও আইনজীবী

