ডাকসুর উদ্যোগ ও প্রশাসনের আপত্তি: একটি পর্যালোচনা
শিক্ষার্থীরা প্রতিটি সেমিস্টারে পরীক্ষা দেন, ক্লাস টেস্টে বসেন, মিডটার্ম ও ফাইনালে মূল্যায়িত হন। কিন্তু যিনি তাঁদের পড়ান, সেই শিক্ষকের পাঠদানের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত জানার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জায়গা এত দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল না। এই ফাঁকা জায়গাটি পূরণ করতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সম্প্রতি চালু করেছে “ডিইউ ইভ্যালুয়েশন” নামে একটি ওয়েবসাইট, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিভাগের শিক্ষকদের কোর্স কাঠামো, শিক্ষাদান পদ্ধতি, যোগাযোগ, পরীক্ষা-মূল্যায়ন ও পেশাদারত্বের ভিত্তিতে রেটিং দিতে পারছেন।
কিন্তু এই উদ্যোগ চালুর পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি এসেছে। প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষক মূল্যায়নের “এখতিয়ার” ডাকসুর নেই, এবং এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো, একটি ছাত্র সংগঠন যখন দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা পূরণ করতে এগিয়ে আসে, তখন প্রশাসনের প্রথম প্রতিক্রিয়া কি হওয়া উচিত বন্ধ করে দেওয়া, নাকি সেই উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া?
যে শূন্যতা থেকে এই উদ্যোগের জন্ম
ডাকসুর নেতারা জানিয়েছেন, শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহারেই ছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করেও বিষয়টির কোনো সুরাহা হয়নি। প্রায় এক বছর অপেক্ষার পর, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কার্যত থমকে থাকায়, ডাকসু নিজ উদ্যোগে এই প্ল্যাটফর্ম চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই প্রেক্ষাপটটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি এমন নয় যে ডাকসু হঠাৎ করে কোনো অননুমোদিত কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে চেয়েছে। বরং এটি এক ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফলাফল; যেখানে একটি যৌক্তিক, শিক্ষার্থীবান্ধব প্রস্তাব বছরের পর বছর ফাইলবন্দী থেকে গেছে। প্রশাসন নিজেও স্বীকার করেছে যে শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য একটি অনুমোদিত নীতিমালা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আগেই পাস হয়েছে, অথচ তার বাস্তবায়ন এখনো বাকি।
মূল্যায়ন কেন জরুরি
শিক্ষক মূল্যায়ন কোনো নতুন বা বিতর্কিত ধারণা নয়। বিশ্বের অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষক মূল্যায়ন একটি প্রতিষ্ঠিত চর্চা। এর মাধ্যমে,
- শিক্ষকেরা নিজেদের পাঠদান পদ্ধতির দুর্বলতা ও শক্তির জায়গা সম্পর্কে বাস্তব প্রতিক্রিয়া পান।
- বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মান পর্যবেক্ষণ ও উন্নয়নের সুযোগ পায়।
- শিক্ষার্থীরা অনুভব করেন যে তাঁদের শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম নিজেও স্বীকার করেছেন, শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা উচিত, যার মাধ্যমে শিক্ষকেরা বুঝতে পারবেন তাঁদের অবস্থান কোথায় এবং কোথায় উন্নতি প্রয়োজন। অর্থাৎ, মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশাসনের মধ্যেও দ্বিমত নেই, দ্বিমত শুধু কে এটি বাস্তবায়ন করবে, তা নিয়ে।
“এখতিয়ার নেই” যুক্তিটি কতটা যথেষ্ট?
প্রশাসনের প্রধান আপত্তি হলো, শিক্ষক মূল্যায়ন করার এখতিয়ার ডাকসুর নেই এবং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। কাঠামোগতভাবে এই যুক্তির একটি ভিত্তি আছে, আনুষ্ঠানিক নীতিমালাবিহীন কোনো মূল্যায়ন ব্যবস্থায় পদ্ধতিগত ত্রুটি, পক্ষপাত বা অপব্যবহারের ঝুঁকি অস্বীকার করা যায় না। একজন শিক্ষক যিনি নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকেন, আর যে শিক্ষার্থী নিজেই অনিয়মিত, তাঁর মূল্যায়ন কতটা প্রতিনিধিত্বমূলক হবে, এই প্রশ্নও অমূলক নয়।
কিন্তু এই যুক্তি যদি সত্যিকারের উদ্বেগ থেকে আসত, তাহলে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হতো দ্রুত নিজস্ব ব্যবস্থা কার্যকর করা, বন্ধের হুমকি বা নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা নয়। এখতিয়ারের প্রশ্ন তোলা আর জবাবদিহিতার দাবিকে থামিয়ে দেওয়ার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। প্রশাসন যখন বলে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে নিজস্ব মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু হবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এত বছরের অপেক্ষার পর, কেন ঠিক এই মুহূর্তে, যখন একটি বিকল্প ব্যবস্থা বাস্তবে কার্যকর হয়ে গেছে, তখনই দ্রুত সময়সীমা ঘোষণা করা হলো?
স্বচ্ছতা বনাম নিয়ন্ত্রণ
এই বিতর্কের কেন্দ্রে আসলে একটি গভীরতর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে, মূল্যায়নের ফলাফল কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আর তা কতটা উন্মুক্ত থাকবে?
ডাকসুর প্ল্যাটফর্মে মূল্যায়নের ফলাফল সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, যদিও মূল্যায়নকারীর পরিচয় গোপন রাখা হয়। এই স্বচ্ছতাই সম্ভবত প্রশাসনের অস্বস্তির একটি বড় কারণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত মূল্যায়ন ব্যবস্থাগুলো প্রায়ই অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক নথিতে সীমাবদ্ধ থাকে, ফলাফল সাধারণত প্রকাশ্যে আসে না। কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন সংগত, যে তথ্য তাঁদের নিজেদের শিক্ষাগত অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসছে, তা কেন শুধু প্রশাসনের অভ্যন্তরে বন্দী থাকবে?
ঝুঁকি অস্বীকার না করেই এগিয়ে যাওয়ার পথ
এটি ঠিক যে, কাঠামোবিহীন কোনো মূল্যায়ন ব্যবস্থা অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহযোগী অধ্যাপক এই উদ্যোগকে “অনধিকার চর্চা” আখ্যা দিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে এটি ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা বা এমনকি “মব” পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। এই উদ্বেগকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা ঠিক হবে না।
কিন্তু এই ঝুঁকি মোকাবিলার পথ মূল্যায়ন বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং দ্রুত এটিকে একটি স্বচ্ছ, নিয়মভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে আনা। ডাকসুর ভিপি নিজেই বলেছেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে বিরোধ তৈরি নয়, বরং একটি কার্যকর ফিডব্যাক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। প্রশাসন যদি সত্যিই আন্তরিক হয়, তাহলে ডাকসুর এই উদ্যোগকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং একটি চাপ হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের দীর্ঘদিন আটকে থাকা নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোতে পারে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের ছায়া: একটি বৃহত্তর উদ্বেগ
শিক্ষক মূল্যায়ন নিয়ে এই বিতর্কটিকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেখাও জরুরি। গত কয়েক মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শিক্ষকদের সঙ্গে ভিন্ন আচরণের অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে। “রাষ্ট্রবিরোধী” গোপন তৎপরতায় জড়িত থাকার অভিযোগে একদল শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে, আবার ২৩১ জন শিক্ষকের একটি তালিকা তৈরি করে শাস্তির দাবিও উঠেছিল, যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের ভাষ্য, অভিযোগ প্রমাণের আগেই কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া একাডেমিক স্বাধীনতা ও স্বাভাবিক বিচারপ্রক্রিয়ার পরিপন্থী।
এই তালিকা প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন সাদা দল অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অপপ্রচার বলে অস্বীকার করেছে, আবার আওয়ামী লীগ-সমর্থিত নীল দল একে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপ্রসূত বলে আখ্যা দিয়েছে। দুই শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করে ট্রাইব্যুনাল গঠনের ঘটনায় শিক্ষক সমাজের একাংশ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক ও একাডেমিক পরিবেশ সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে। এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শিক্ষক-গবেষকেরাও এক যৌথ বিবৃতিতে সতর্ক করেছেন যে, শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে তালিকাভুক্ত করে শাস্তির আওতায় আনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং তা স্বাধীন জ্ঞানচর্চার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এই ঘটনাপ্রবাহ শিক্ষক মূল্যায়ন বিতর্ক থেকে প্রযুক্তিগতভাবে আলাদা হলেও, দুটির মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত যোগসূত্র আছে। ক্যাম্পাসে যখন ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে ছাড় দেওয়া আর কাউকে টার্গেট করার অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন কোনো নতুন মূল্যায়ন প্রক্রিয়া, তা প্রশাসনের হোক বা ছাত্র সংগঠনের, যদি স্পষ্ট, নিরপেক্ষ মানদণ্ড ও স্বাধীন তত্ত্বাবধান ছাড়া চালু হয়, তবে তা একই রাজনৈতিক মেরুকরণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। প্রশ্ন উঠতে পারে, মূল্যায়নের রেটিং কি সত্যিই শুধু পাঠদানের মান প্রতিফলিত করবে, নাকি কোনো শিক্ষকের রাজনৈতিক অবস্থান বা মতাদর্শগত পরিচয়ও তাতে প্রভাব ফেলবে? যিনি ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সহানুভূতিশীল, তাঁর রেটিং কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো হয়ে যাবে, আর যিনি ভিন্নমতের, তাঁকে কি বেছে বেছে কম নম্বর দেওয়া হবে বা অভিযুক্ত করা হবে?
এই আশঙ্কাগুলো এখনই এই নির্দিষ্ট মূল্যায়ন ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে প্রমাণিত কোনো অভিযোগ নয়, এই মুহূর্ত পর্যন্ত duevaluation.com নির্দিষ্টভাবে রাজনৈতিক পক্ষপাতের জন্য অভিযুক্ত হয়েছে, এমন প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। বরং এই আশঙ্কা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে উদ্ভূত একটি যৌক্তিক সতর্কতা। কিন্তু ঠিক এই কারণেই মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে কোনো নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠন বা রাজনৈতিক ধারার একক নিয়ন্ত্রণে না রেখে একটি স্বাধীন, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে আনা জরুরি, যেখানে মানদণ্ড আগে থেকে নির্ধারিত ও প্রকাশ্য থাকবে, ফলাফল যাচাইযোগ্য হবে, এবং কোনো শিক্ষকের রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর মূল্যায়নকে প্রভাবিত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার মতো স্বচ্ছ পর্যালোচনা প্রক্রিয়া থাকবে।
শেষ কথা
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ভর করে তার শিক্ষার মানের ওপর, আর শিক্ষার মান যাচাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা। ডাকসুর এই উদ্যোগ প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার বিরুদ্ধে একটি বার্তা—শিক্ষার্থীরা আর নীরবে অপেক্ষা করতে রাজি নন। প্রশাসনের উচিত এই বার্তাকে হুমকি হিসেবে না দেখে, নিজেদের প্রতিশ্রুত নীতিমালা বাস্তবায়নের তাগিদ হিসেবে গ্রহণ করা।
শিক্ষক মূল্যায়ন বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। প্রকৃত সমাধান হলো দ্রুত, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসন সবাই একসঙ্গে বসে ঠিক করবেন কীভাবে এই মূল্যায়ন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অর্থবহ হবে। ততদিন পর্যন্ত ডাকসুর এই উদ্যোগ বন্ধ করার চেষ্টা শুধু একটি ভুল বার্তাই দেবে—শিক্ষার্থীদের কণ্ঠকে থামিয়ে দেওয়ার বার্তা।

