ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী নানা পরিচয়ের কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি চিকিৎসক, মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজনৈতিক চিন্তক। জনস্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন এককভাবে সংগ্রাম করে গেছেন এবং প্রতিষ্ঠা করেছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। তাঁর চিন্তা ও কর্ম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে।
গবেষণা: উপনিবেশীকরণের একটি কৌশল:
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী
আমরা বলে থাকি, যুদ্ধ, দারিদ্র্য, জনসংখ্যার আধিক্য এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের কষ্টের কারণ। কিন্তু এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, ‘বিনিয়োগকৃত সাহায্য’ বা মূলত ধনী দেশের স্বার্থে প্রদত্ত সাহায্য আমাদের দুর্ভোগের জন্য বেশি না হলেও সমান দায়ী। আসুন এবার বিশেষভাবে দেখা যাক চিকিৎসা শাস্ত্রে গবেষণার ক্ষেত্রে কী ঘটছে?
রকফেলার সম্পত্তির প্রধান প্রশাসক ও প্রাক্তন ব্যাপটিস্ট মিনিস্টার মি. ফ্রেডারিক টি. গেটস ১৯০৫ সালে রকফেলারকে জানিয়েছিলেন, ‘ধর্মান্তরের প্রশ্নটি বাদ দিলেও বিদেশে আমাদের মিশনে যে টাকা আমরা ব্যয় করছি, প্রতি বছর তার চেয়ে হাজারগুণ অর্থ আমাদের দেশে চলে আসছে মিশনারি কাজের ফলে অর্জিত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড থেকে। আমাদের রপ্তানি ব্যবসা শনৈঃ শনৈঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
মিশনারি প্রচেষ্টায় বিদেশের ভূমির বাণিজ্যিক বিজয় না হলে এই প্রবৃদ্ধি কিছুতেই সম্ভব হতো না। দেশের শিল্প ও উৎপাদনে সে দারুণ এক আশীর্বাদ। কিন্তু অচিরেই এইসব সাম্রাজ্যবাদীরা আবিষ্কার করল যে, মিশনারিরা তাদের জন্য যা করেছে তার চেয়ে অনেক বেশি করতে পারবে ওষুধ।
উপনিবেশ স্থাপনে ওষুধ-শক্তি
বিশ্বের সমস্ত অনুন্নত দেশের বড় বড় মানবকল্যাণমূলক ফাউন্ডেশনগুলো বুঝতে পেরেছিল যে, ‘মিশনারি তৎপরতার তুলনায় শিল্প-অনুন্নত দেশকে উপনিবেশ বানানোর জন্য ওষুধ এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি।’
কিন্তু ওষুধকে প্রধানত তাদের লাভের মাধ্যম হিসেবে ধরে রাখতে হলে চিকিৎসা-সেবাকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। রকফেলার আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কর্মসূচীতে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে ‘টাকা-পয়সার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে আমাদের নিজেদের লোকের হাতে, নেটিভদের হাতে নয়।’
মাও-পূর্ব চীনে পিকিং ইউনিয়ন মেডিক্যাল কলেজকে মিশনারিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে সরিয়ে রকফেলার ফাউন্ডেশনের অধীনে ন্যস্ত করা হয়েছিল, কিন্তু তা সম্পূর্ণভাবে পরিচালিত হয় নিউইয়র্ক থেকে আনা কর্মচারী দ্বারা এবং পিকিং-এ স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত অফিসের মাধ্যমে।’
তাদের চেষ্টা সফল হয়েছিল। জন হপকিন্স স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ-এর প্রথম ডিন মি. উইলিয়াম আর. ওয়েলচ ‘বিশাল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলসমূহে উপনিবেশ স্থাপন এবং সভ্যতা উদ্ধার করা’র ব্যাপারে আমেরিকার হয়ে কাজ করার জন্য আমেরিকান বিজ্ঞানীদের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
নতুন এক সাম্রাজ্যবাদ
এবারে এক নতুন যুগ, নতুন এক প্রজাতন্ত্রকে উদ্ধার করতে উদ্যত হয়েছে। সেই প্রজাতন্ত্রের নাম ‘বাংলাদেশ’। এখন যেমন তেমনি অতীতেও পণ্য-ভারাক্রান্ত আমেরিকার বাজার তাদের পণ্য বিপণনের জন্য নতুন উপনিবেশ সন্ধানে তৎপর ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা গবেষণা মহল আজো সম্প্রসারণের নতুন এলাকার জন্য একই রকম হন্যে হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, চিকিৎসা গবেষণায় নিয়োজিত আমেরিকার পেশাদারগণ তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন। পেশার জগতে আসন লাভে কিংবা পরিচিতি কিংবা নেহাত ‘টিকে থাকা’র জন্য অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। আর সেই অভিজ্ঞতাটি নিজ দেশে পাওয়া খুব সহজ নয়।
দ্বিতীয়ত, আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে ‘অর্থ’ এবং বর্ধিত মর্যাদার বড় চাহিদা। গবেষণা কর্ম এই উভয় ক্ষেত্রেই সুযোগ সৃষ্টি করে।
তৃতীয়ত, মুনাফা বৃদ্ধি করার জন্য সচেষ্ট বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো বাজার সম্প্রসারণের জন্য সবিশেষ তৎপর।
স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশে এই তিন গ্রুপের জন্যই রয়েছে অপরিসীম সুযোগ।
ল্যাবরেটরির মতো তৃতীয় বিশ্ব
পদ্ধতিটি এখন একটা ছকে এসে গেছে। বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বয়সে নবীন পেশাদারদের সামনে মোটা বেতন ও লোভনীয় অন্যান্য সুবিধাসহ চাকরির টোপ মেলে ধরে। তারপর অনুন্নত ও জনসংখ্যা সমস্যায় আক্রান্ত দেশের কাছে স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিবার-পরিকল্পনা সংক্রান্ত একটি পরিকল্পনা নিয়ে হাজির হয়। সম্পূর্ণ না হলেও পরিকল্পনার সিংহভাগের অর্থায়ন করে অনুন্নত দেশে কর্মরত আমেরিকা সরকারের কর্মকর্তাবৃন্দ। আতিথ্য দানকারী (host) দেশের কতক সরকারি কর্মকর্তাদের সরকারি কার্যক্রমের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করে তাদের প্রকল্পে। এমনি করে প্রকল্প স্থানীয় সরকারের মধ্যে ‘প্রবেশ’ করে। তবে এই ‘প্রবেশ’ দ্বারা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ থেকে কোনো রকম ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। বিদেশী শক্তির সাহায্য ছাড়া প্রকল্প সামাল দেওয়ার মতো পর্যায়ের কোনো ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না।
এভাবে প্রকল্পগুলো প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি লাভ করে। ‘স্টাডি’ প্রণয়ন করা হয়, প্রকাশ করা হয় প্রতিবেদন, পরিসংখ্যান সঙ্কলিত হয়—এ সবকিছুই করে স্থানীয় লোকজন। আর স্থানীয় লোকজনের অর্জিত এই কাজের সুফল ভোগ করে বিদেশী উচ্চাভিলাষী যুবক, মর্যাদা ও অর্থসচেতন বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ, যাদের কাছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো চমৎকার ল্যাবরেটরি ভিন্ন আর কিছু নয়।
সমাধান এড়িয়ে যাওয়া
এতে করে আতিথ্য দানকারী অনুন্নত দেশের লাভটা কী হচ্ছে? এই কাজের জন্য যেসব বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তাদের বেলায় লাভের খাতা শূন্য। বিদেশী গবেষণার আধিক্য স্থানীয় প্রয়াসের প্রবৃদ্ধিকে স্তব্ধ করে দেয়। ফলে স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের আধিপত্য হয় একচেটিয়া। জনসংখ্যাকে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার সমাধান সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এই প্রকৃত সমাধান এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে একটা কৌশল। আমেরিকায় আমেরিকান চিকিৎসা-গবেষকদের প্রায়শই এই কৌশলের চর্চা করতে বাধ্য করা হয়। হাইপারটেনশন ও ক্যান্সারের মতো ঘাতক ব্যাধির প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য লক্ষ-কোটি টাকা ব্যয় করা হয়, অথচ বিজ্ঞানীরা জানেন এটা আবিষ্কার করা চলবে না, কারণ এখানকার মতো আমেরিকাতেও প্রকৃত সমাধান আবিষ্কার করে ফেললে জীবনধারা ও অর্থনৈতিক সিস্টেমে মৌলিক পরিবর্তন চলে আসবে এবং যারা গবেষণাকে নিয়ন্ত্রণ করেন তারা অস্বস্তিকর অবস্থায় পতিত হবেন।
আবার জন হপকিন্স
গত বছর মিশনারি কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন মেডিক্যাল ভদ্রলোককে জন হপকিন্স স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ-এর ডিনের পদ গ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি তার বদলে ঢাকার এক অফিসে একটা পদ গ্রহণ করেন। তিনি জানেন, ডিনের চাকরির চেয়ে ঢাকার পদটি তাঁকে অনেক বেশি কিছু দিতে পারে। এখানে থেকে পুরনো সাম্রাজ্যবাদের জন্য তিনি এক নতুন পরিকল্পনা বানানোর কলকাঠি নাড়তে পারবেন।
কিছুদিন আগে এই ভদ্রলোক এবং কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরির কতিপয় প্রাক্তন কর্মকর্তা মিলে বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করেন। তাঁরা প্রস্তাবের নাম দেন ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ, পপুলেশন অ্যান্ড নিউট্রিশন রিসার্চ’। গভর্নমেন্টকে এই প্রস্তাব বিবেচনার জন্য অনুরোধ করেন এই যুক্তিতে যে, কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরির জন্য আর টাকা পাওয়া যাবে না। সূক্ষ্ম কিন্তু প্রতারণামূলক এক চাপ সৃষ্টি করা হলো। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, অবিলম্বে এই প্রস্তাব সরকারের যোগসাজশে প্রণয়ন ও চূড়ান্ত করার জন্য একজন বিদেশী আগামী এক বছরে ফোর্ড ফাউন্ডেশন থেকে পনেরো লক্ষ টাকা পাবেন।
এই ফোর্ড ফাউন্ডেশনই ১৯৭৪ সালে মন্ত্রণালয়টি বিভক্ত করার জন্য ‘বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ’ গ্রহণ না করায় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার এক প্রাক্তন মন্ত্রীর জন্য ‘বিদেশ ভ্রমণের’ সুযোগ করে দিয়েছিল। ফাউন্ডেশন তাদের এই প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত রেখেছে।
কেমন করে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা এবং সমাজকল্যাণ খাতে জাতীয় স্বার্থ বিদেশী রাষ্ট্র তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আত্মসাৎ করে এই ইনস্টিটিউটের প্রস্তাব তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, মূলত আমেরিকান গবেষকদের স্বার্থে পরিকল্পিত এই ইনস্টিটিউট জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর ও স্বাধীন কোনো স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি গ্রহণের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করবে। এর জন্য বাংলাদেশ হবে একটা ল্যাবরেটরি বিশেষ। তার জনসংখ্যা এই এক্সপেরিমেন্ট থেকে লাভবান হতেও পারে, আবার নাও পারে এবং সবকিছু করা হবে আমেরিকার সহযোগে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থাপনা, অর্থ ও লোকজনের মাধ্যমে।
সব আমেরিকার স্বার্থে
উক্ত প্রস্তাবে আছে: ‘আমেরিকার মতো উন্নত দেশের নবীন অনুসন্ধানকারীদের নিমিত্তে প্রতিষ্ঠিত এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচীর আমেরিকা অথবা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক যোগসূত্র রচনার প্রয়োজন হবে। উন্নত দেশের নবীন বিজ্ঞানীরা যাতে উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা এবং পুষ্টি সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে সেজন্যই এই যোগসূত্রকে উৎসাহিত করতে হবে।’
তাহলে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ প্রদানের জন্য অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের অনুন্নত দেশে পাঠানো হচ্ছে না। পাঠানো হচ্ছে অনভিজ্ঞ যুবা পুরুষদের যাদের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন আছে। যারা কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীদের প্যাটার্ন অনুসরণ করলে উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবেলার জন্য কেবল ইংরেজি ভাষায় কথা বলবে।
প্রস্তাবে আরো আছে, ‘প্রস্তাবিত গবেষণা কর্মসূচীর মূলমন্ত্র হবে রিসার্চ প্রোগ্রাম পরিচালনার জন্য বিদেশের বিজ্ঞানী জনবল সংগ্রহ করা’ এবং ‘স্থানীয় টেকনিক্যাল ও সহায়ক কর্মচারী বৃদ্ধির কোনো বিবেচনা এই প্রস্তাবের মধ্যে থাকবে না।’ এই প্রস্তাবে আরো আছে, ‘প্রস্তাবের অন্তর্গত ক্যারিয়ার গঠনের জন্য উপযুক্ত বাংলাদেশী পেশাজীবীর সংখ্যা খুবই কম।’
প্রস্তাবে এ কথা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন অনুভূত হয়নি যে, কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরির জন্মের আগেই ল্যাবরেটরির তিনজন বাংলাদেশীকে অন্যত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তবে বাংলাদেশী বিজ্ঞানীদের কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে প্রশিক্ষণের কী পরিণতি হয়েছে, কিংবা নতুন প্রস্তাবে তাদের কী গতি হবে সে বিষয়ে এইসব উদ্ধৃতিতে কিছুই স্পষ্ট করে বলা হয়নি। উভয় ক্ষেত্রের জন্য জবাব, কিছুই না। কেবল ষাটের দশকেই যদি কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে শতাধিক আমেরিকান বিজ্ঞানীর প্রশিক্ষণ হয়ে থাকে, প্রতিষ্ঠার ১৬ বছর পরে কেন সেখানে নির্ধারিত পদের জন্য কোনো বাংলাদেশীর প্রশিক্ষণ হয়নি? নিশ্চয়ই উপযুক্ত লোক পাওয়া যায়নি বলে নয়। (বাংলাদেশী বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ এই ল্যাবে কস্মিনকালেও উদ্দেশ্য ছিল না। নতুন প্রস্তাবেও সে রকম কোনো অভিলাষের চিহ্ন নেই।) নতুন প্রস্তাবে আছে হাসপাতাল ও মাঠ কর্মসূচী (ফিল্ড ওয়ার্ক) পরিচালনা করার কথা। কারণ এতে বাংলাদেশীদের নিয়োগ করা যাবে এবং বৈজ্ঞানিক ব্যাপারে তাদের নাক গলাবার কিছু থাকবে না।’
তবে প্রস্তাবে বাংলাদেশীর জন্য সিনিয়র প্রশাসনিক অফিসারের একটি বিশেষ পদের সংস্থান আছে। এই অফিসার ‘বাংলাদেশে স্থানীয় সমস্ত কাজের জন্য সাকল্যে দায়িত্ব বহন করবেন।’ কয়েকটা প্রেক্ষিতে এই ব্যবস্থাকে দেখা গেলেও এর প্রধান উদ্দেশ্য থাকবে একটাই: সরকারি কর্মকর্তাদের সবকিছুর নাগালের বাইরে রাখা। ল্যাবরেটরির ব্যাপারে এই অফিসারকে অন্য কোনো বাংলাদেশী অফিসারের কাছে জবাবদিহি করতে হবে না। অথচ তিনি তাদের বেতনভুক কর্মচারী হয়ে থাকবেন। এতে করেই সৃষ্টি হবে অবাধ অনিয়ন্ত্রিত গবেষণার অভীষ্ট পরিবেশের। কিন্তু সিনিয়রিটি কেন? যুবক-পূজারী আমেরিকায় তো দায়িত্বশীল পদে সিনিয়র অফিসার থাকেন না, তাদের আসল কাজের দায়িত্বও দেওয়া হয় না। তাদের রাখা হয় কেবল প্রবেশ পথে। তাহলে বাংলাদেশের বেলায় সিনিয়র কেন? এটা হলো অবসর নিতে যাওয়া সরকারি সিনিয়র অফিসার বা তার বন্ধু-বান্ধবদের জন্য একটা বিশেষ টোপ। এটা কোনো নিয়ন্ত্রণকারী পদ নয়, তবে বেশ গালভরা। অবশ্য এই সিনিয়রিটির ফলে সরকারের কাছে এর বেশ ওজন থাকবে।
কিন্তু সরকারের জন্য এই ওজন অন্যান্য মহল থেকেও তো আসতে পারে। প্রস্তাবে আছে ‘বিদেশ থেকে, যেখানে পাওয়া যায় সেখান থেকে, বৈজ্ঞানিক কর্মচারী নিয়োগ করার জন্য অঢেল অর্থের সংস্থান করতেই হবে।’ প্রোগ্রামে আছে ‘এর কাজকর্ম পরিচালিত হবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এজেন্সি ও সরকারের বিভিন্ন উৎস থেকে’ প্রাপ্ত অর্থের সাহায্যে। এর ৫০% ভাগেরও অধিক অর্থ নিয়ন্ত্রণ করবে আমেরিকা থেকে আগত ‘আন্তর্জাতিক’ বোর্ড। যে কোনো সরকারের এটা আসল ক্ষমতা, আসল ওজন। এই প্রস্তাবে আরো আছে, ‘এই ল্যাবের সফল পরিচালনা সর্বতোভাবে নির্ভর করবে এর ব্যবস্থাপনায়, সংগ্রহ, শিপিং যন্ত্রপাতি এবং এতে কর্মরত বিদেশী কর্মকর্তাদের কার্যাবলী তত্ত্বাবধানের জন্য আমেরিকার যথোপযুক্ত প্রশাসনিক সমর্থন ও সাহায্য।’ সংগ্রহ, শিপিং, সরবরাহ, যন্ত্রপাতি—তার মানে আমেরিকার পণ্য ও অনুপযুক্ত প্রযুক্তির এক নতুন বাজারের দরজা খুলে গেল এবং আমেরিকা সব চালাবে, এমনকি বিদেশী কর্মকর্তাদের কার্যাবলীসহ।
বাংলাদেশ কেন?
প্রস্তাবে আছে, ‘প্রাকৃতিক কারণে অর্জিত সংক্রমণের নিরোধজনিত প্রতিকার (Immunological responses to naturally acquired infection) সম্বন্ধে গবেষণার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পথে কৃত্রিম নিরোধ ব্যবস্থায় মানবদেহের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারেও গবেষণা করার একটা কর্মসূচী গ্রহণ করা হবে।’ আমেরিকায় এই গবেষণা করা হয়েছে জন্তুর ওপর। এর পরবর্তী সোপান হবে মানবদেহের ওপর এই পরীক্ষা চালানো আর সেই মানব হবে অবশ্যই বাংলাদেশ থেকে নেওয়া। এটা কেন হলো, যে আমেরিকানদের কাছে ‘ব্যক্তির পবিত্র অধিকার’ এত প্রিয়, তারা মানুষজনের জন্য কেন প্রাচ্যের দিকে তাকায়? বাংলাদেশেও মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা আছে, আছে ভয়, আছে ব্যক্তির অধিকার।
ব্যক্তি যদি না থাকে তাহলে তো চিকিৎসা গবেষণা অর্থহীন হয়ে যায়। সেবা করার মতো মানুষ রইল না, রইল কেবল অহংয়ের সন্তুষ্টির জন্য পরিসংখ্যান। আবার ব্যক্তিকে বাদ দিলে বৈজ্ঞানিক সত্যেরও তো আর প্রয়োজন থাকে না। এটা আমাদের আগেই বোঝা উচিত ছিল, আমরা বুঝিনি। এখন এই প্রস্তাবটা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। সেবাদান কলেরা হাসপাতালের মূল উদ্দেশ্য ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল ল্যাবকে সমর্থন দেওয়া।’ মতলবে মাঠ পর্যায়ের তত্ত্বাবধান কার্যক্রম ‘সমগ্র মহামারী রিসার্চ প্রোগ্রাম ও জনসংখ্যা সংক্রান্ত গবেষণার জন্য সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত ছিল।’ ফাঁকতালে মানুষকে সাহায্য করার যদি সুযোগ ঘটে যায়, তাতে তো কিছু যায় আসে না।
তারপর প্রস্তাবিত প্রোগ্রামে এমন বর্ণনারও সাক্ষাৎ পাওয়া যায়: ‘দুগ্ধবতী মেয়েদের পুষ্টিগত অবস্থার উন্নয়ন ঋতুবদ্ধতার (Amenorrhea) কাল কমিয়ে দেবে, আর তাতে সন্তান প্রসব আরো ঘন ঘন হবে। তাতে শিশুর একদিকে মঙ্গল ব্যাহত হবে, অন্যদিকে জন্মহার বেড়ে যাবে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি দ্রুততর হবে।’ মাতৃদুগ্ধজনিত ঋতুবদ্ধতার স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করে উর্বরতা দমন করার জন্য দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি কার্যকর হতে পারে।’ এই উক্তির দ্বারা প্রণেতা আমাদের কী বোঝাতে চান? বাংলাদেশকে অপুষ্টির শিকার করে রাখা উচিত? লক্ষ্য করতে হবে, এখানে অসুস্থ মানুষের কথা বলা হয়নি, বলা হয়নি ক্ষুধার্ত মানুষের কথা। এখানে উদ্বেগের মূল কারণ কোনো মানুষ নয়। এখানে বলা হয়েছে, ‘দুর্ভিক্ষের সময় মানুষের প্রজনন ক্ষমতার তারতম্য ঘটায় যেসব জৈবিক ও সামাজিক পরিবর্তন’ তার বিচার-বিশ্লেষণের কথা। গবেষণা ও বিচার-বিশ্লেষণ, ব্যস, আর কিছু নয়। স্বাধীনতার পর সারা দেশ সয়লাব হয়ে গিয়েছিল পরিকল্পনাবিদ আর বিশেষজ্ঞে। ১৯৭৪ সালে তারা দুর্ভিক্ষ দমনের জন্য কিছুই করেনি। কারণ তখন তাদের উদ্দেশ্য ছিল সম্ভবত দুর্ভিক্ষের সময় এখানকার অধিবাসীদের মধ্যে জীবগত (Biological change) যে পরিবর্তন দেখা দেয়, তার স্বরূপ নির্ণয় করা।
প্রয়োগ বিহীন গবেষণা
কলেরার পুরনো টিকা কলেরা নিরোধে কাজ করে না বলে প্রমাণিত হয়েছে। পরবর্তীকালে আরো একটি কলেরা টক্সয়ড ভ্যাকসিন বের করা হয়েছিল। পরীক্ষার পর সেটাও অকার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই দুটো অকার্যকর টিকার ওপর আর একটি গবেষণা হচ্ছে। এই দেশে ৫০% মৃত্যু হয় ডায়রিয়াজনিত অসুখে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৬০%। মুখে খাওয়ার কলেরা প্রতিষেধক আবিষ্কার হচ্ছে কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরির একটি বড় মাপের কৃতিত্ব। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ জায়গায় মুমূর্ষু রোগীদের জন্য এই ওষুধ পাওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক মেডিক্যাল জার্নাল ‘ল্যানসেট’ (Lancet)-এর ২৭ নভেম্বর, ১৯৭৬ সংখ্যায় এ বিষয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। তাতে এই ওষুধ প্রয়োগের ব্যর্থতার ফলে কেমন করে কলেরা গবেষণার রেকর্ড কলঙ্কিত হয়েছে তা বলা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে, মতলব কলেরা হাসপাতালের বর্জ্য দ্বারা যে পানি দূষিত হয়, তা থেকে গড় হারের চেয়ে ২০% বেশি কলেরা ও ডায়রিয়াজনিত অসুখ হয়। এই হলো অযোগ্য গবেষণার চিত্র, যে গবেষণা অকার্যকর ভ্যাকসিন পরীক্ষার নিমিত্তে একটি কলেরা অধ্যুষিত এলাকা সৃষ্টি করে এবং তাকে চিরস্থায়ী ভিত্তিতে লালন করার ব্যবস্থা করে।
এই কাজটি করার জন্য বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ হচ্ছে ১৭ লক্ষ ডলার। এর মধ্যে ১০ লক্ষ ডলার ব্যয় হয় ৭ জন বিদেশী কর্মকর্তাদের স্বদেশ-ছুটি, শিক্ষা, বিনোদন, বিশাল বাড়ি ও তার সজ্জিতকরণ ইত্যাদিতে। বাকি সাত লাখ ডলার ডায়রিয়া রোগীর চিকিৎসা ও ৭৭০ জন বাংলাদেশী কর্মচারীর যাবতীয় ব্যয় বাবদ। পরবর্তী কয়েক বছরের জন্য এই বরাদ্দ বাড়িয়ে ২ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার করার জন্য নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে। এতে আরো ১২ জন বিদেশী কর্মকর্তার সংস্থান আছে, আর বাংলাদেশী একজনও না—সেই সিনিয়রিটি অবশ্য আছে। স্পষ্টত এই বাজেটের উদ্দেশ্য জীবনধারায় আরো বিলাসবহুল সুবিধা আনয়ন। এই প্রস্তাবের কাঠামো এবং ফোর্ড ফাউন্ডেশন, বিশ্ব ব্যাংক ও ইউএসএইড-এর সঙ্গে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের কারণে ইনস্টিটিউটের এখতিয়ারভুক্ত সমস্ত বিষয়ে সমস্ত গবেষণা এই কর্মসূচীর মাধ্যমে সম্পন্ন হতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে মনোপলি একচেটিয়া অধিকার। বিজ্ঞানের মনোপলি, বাংলাদেশের সমস্ত বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান বিকাশের শ্বাসরোধ করার মনোপলি। আর এই ইনস্টিটিউট প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কোনোভাবেই বাংলাদেশী বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণের মধ্যে নেই। বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক অর্থ বিদেশী গ্রুপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা মানে সচেতন কি অচেতনভাবে সরকারি ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর একটা চাপ বহাল রাখা। তার অর্থ হবে বাংলাদেশের ভেতর আমেরিকান গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা। তার অর্থ হবে বাংলাদেশে আমেরিকার ওষুধ ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতির রপ্তানিকারকদের স্বাধীনতাও—তারা এখন সম্ভবত অবাঞ্ছিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে সক্ষম এমন সব নতুন পণ্য সম্বন্ধে গবেষণা চালাচ্ছেন।
যা ঘটা সম্ভব তার একটি নমুনা দেখা যাক। উল্লেখ থাকে যে, এই প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহারকে চ্যালেঞ্জ করা খুব কঠিন হবে। কেননা তাতে পূর্ব অনুমোদন থাকবে। বাংলাদেশে জন হপকিন্স ফার্টিলিটি রিসার্চ প্রজেক্ট মতলবে জন্মনিরোধক ইনজেকশন ‘ডিপো প্রোভেরা’র ব্যবহারের ওপর নিজস্ব উদ্যোগে একটা গবেষণা চালিয়ে ছিল। এতে দেখা যায়, এই ইনজেকশন মাসিকের বিরাট বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং মায়ের দুধ কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশে আরো এক জায়গায় ডিপো প্রোভেরার ওপর অনুরূপ আরেকটি বড় মাপের গবেষণা করা হয়। মাসিক ও মায়ের দুধ সম্পর্কে এই গবেষণায় একই রকম ফল পাওয়া যায়। জন হপকিন্স প্রজেক্ট এই বড় মাপের গবেষণার প্রণেতার নাম মুছে ফেলে বাংলাদেশী মেয়েদের ক্ষেত্রে মায়ের দুধ হ্রাস পাওয়ার অংশটুকু বাদ দিয়ে তার বদলে অন্যান্য দেশের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে ‘আমাদের বলে যে, তাদের ফলাফলে হ্রাস পাওয়া যায়নি, পাওয়া গেছে বৃদ্ধি।’ এই ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কোনো সমর্থন-সার্ভিস ও ফলোআপ সার্ভিসের ব্যবস্থা না করে খুবই দ্রুততার সঙ্গে জন্মনিরোধের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ইনজেকশন ‘ডিপো প্রোভেরা’কে বাতিল করার মতো ঝুঁকি আমরা নিয়েছি।
মানুষ ও পরিবেশকে প্রকাশ্যে কেমন করে উপেক্ষা করে গবেষক ও পরামর্শদাতারা তার আর একটি উদাহরণ হলো, বিদ্যুৎ ও গ্যাসচালিত অত্যন্ত শক্তিশালী ও সূক্ষ্ম ল্যাপারোস্কোপ যন্ত্র বিশ্ব ব্যাংকের পরামর্শে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামীণ হেলথ সেন্টারে স্থাপন করা হয়েছে। অথচ ব্রিটেনের সব হাসপাতালে এই ল্যাপারোস্কোপ যন্ত্র নেই।
এ কথা অবশ্যই আমাদের বুঝতে হবে যে, চিকিৎসা গবেষকরা হলেন ‘বিশেষজ্ঞ’, তাঁরা মূলত নিজেদের স্বার্থে কাজ করেন।
বিশেষজ্ঞ
কিছুদিন আগে ঢাকা এয়ারপোর্টে পরিচিত এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়। কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর তিনি বলে উঠলেন, তিনি গুণে দেখেছেন, ঢাকায় ৭২ জন বিশেষজ্ঞ আছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আর আপনি? স্বীকার করে বললেন, আমি ৭৩ নম্বর। পাশ্চাত্যের প্রজ্ঞার প্রতি আমাদের পক্ষপাত কাটিয়ে ওঠা হলো এক কঠিন চড়াই পথ অতিক্রম করার মতো। আরো বহুদিন বিদেশী বিশেষজ্ঞের জ্ঞানকে প্রশ্নাতীতভাবে আমাদের সমীহর চোখে দেখে যেতে হবে।
এই যে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে এই বিশেষজ্ঞরা আসছেন, তাদের হাতে থাকে সেই গ্রামের উন্নয়নের নিখুঁত পরিকল্পনা, যে গ্রাম চোখে কোনোদিন তারা দেখেননি, যে গ্রামের সংস্কৃতিতে কোনোদিন তারা বসবাস করেননি এরা কারা? এমনি একজন বসন্ত উচ্ছেদকারীর বিশেষজ্ঞের যোগ্যতা তিনি একজন পাশ-করা মোটর মেকানিক। তা হোক, তিনি তো একজন বিদেশী বটে।
‘আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা হলো পশ্চিমা দেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্রিটিশ রাজত্বের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রবর্তিত ম্যালেরিয়া কর্মসূচী, বিদেশী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কল্পনাপ্রসূত রুরাল হেলথ সেন্টার এবং সাম্প্রতিকতম পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচী—সব বিদেশী বিশেষজ্ঞদের বিশেষ পরামর্শের ফসল। সব মিলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার সিস্টেমকে পঙ্গু, দিকভ্রান্ত ও সম্পূর্ণ নির্ভরশীল করে দিয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বর্তমান বিভক্তি বিশ্ব ব্যাংক ও ইউএসএইড-এর ‘বিশেষজ্ঞ পরামর্শের’ ফল। তারা মনে করে এই করেই জনসংখ্যা সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়ে যাবে। এখন পরিবার পরিকল্পনার জন্য ডাক্তার নিয়োগ করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ডাক্তারদের চেয়ে ৩০% বেশি টাকা দেওয়া হচ্ছে তাদের অথচ তারা একই গ্রাম এলাকায় পাশের অন্য একটি ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ করছেন। এর জন্য যেসব অসুবিধার জন্ম হবে তার আভাস পাওয়ার জন্য খুব একটা কল্পনাশক্তির প্রয়োজন হবে বলে মনে হয় না। প্রতিটি ইউনিয়নে থাকছে পরিবার পরিকল্পনা অফিস, সাবসেন্টার এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য অফিস। ৯২টি আছে মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র। তাদের প্রত্যেকটির আছে ১২টি করে রুম। আছে ২০৫টি রুরাল হেলথ সেন্টার (RHC)। পাঁচ বছরের মধ্যে হবে আরো ১৫০টি রুরাল হেলথ সেন্টার। কিন্তু এইসব অফিসের প্রত্যেকটি তাদের ৩০টি রুমে পরিবার পরিকল্পনার কাজে ব্যবহার করতে পারবে না। মাতৃমঙ্গল কেন্দ্রের লেডি হেলথ ভিজিটররা, যাদের পরিকল্পনাকর্মী বলা হয়, ভালো করে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য ও সমর্থনের জন্য তারা নির্ভর করতে পারবে না রুরাল হেলথ সেন্টারের ডাক্তারদের ওপর। পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় চাচ্ছে প্রতি ৫,০০০ লোকের জন্য একজন কর্মী দেবে তারা। কিন্তু মাত্র এক মাসের প্রশিক্ষণ পাওয়া কর্মীর পক্ষে, মাঠপর্যায়ে কোনো সাহায্য-সমর্থন বা নির্দেশনা ছাড়া এ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না। সরকার তার প্রথম দিককার সমন্বিত স্কীম যদি অনুসরণ করত তাহলে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদানের জন্য তারা এখন অনেক মজবুত ও কার্যকর অবস্থান নিতে পারত।
আমরা জানি, বাংলাদেশের প্রয়োজন নগ্নপদ ডাক্তারের। গ্রামের মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রামে প্রশিক্ষণ প্রস্তাব করল, মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্টদের ৩ বছরের এক লম্বা-চওড়া ট্রেনিং দিতে হবে। এই প্রশিক্ষণ শহরে হবে এবং প্রশিক্ষণার্থীর ১২ বছরের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থাকতে হবে। একটা কেন্দ্র পরিদর্শন করা হলো। ৮০ জন প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে ৬৫ জনের ১২ বছর বা তার অধিক কালের শিক্ষা আছে। কিন্তু তাদের প্রায় সবাই মনে করে ‘জনগণকে উন্নততর সেবা প্রদানের জন্য তাদের উপযুক্ত করতে হলে এই প্রশিক্ষণের মেয়াদ ৪ বছর কিংবা আরো বেশি হতে হবে।’ ‘সেবা’ সে নিশ্চয়ই ঢাকায় কিংবা লিবিয়ায় বসে। তাই তো হচ্ছে বাস্তবে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞ পরামর্শদাতারা যা বোঝেন তার বাইরে আর কিছু গ্রাহ্য করেন না।
এই হলো বিশেষজ্ঞের নমুনা। এরা আমাদের সঙ্গে কিছুদিন ধরে কাজ করছেন। এখন কি এদের কাছে নিজেদেরকে বিক্রি করে দিতে হবে নিঃশর্তে? প্রকৃত বিশেষজ্ঞ অবশ্যই আছেন, উপযুক্ত সাহায্য নামক বস্তুও আছে। প্রকৃত সাহায্য কোনটা আর ‘বিনিয়োগকৃত সাহায্য’ কোনটা তা বের করা মোটেই অসম্ভব নয়। অদূর ভবিষ্যতে স্থানীয়ভাবে দায়িত্ব দেওয়া হবে, এমন কোনো কথা কি এই পরিকল্পনায় আছে? পরিকল্পনা কি প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে প্রকৃত সমাধানের কথা বলতে পেরেছে? এটা কি সততার সঙ্গে তার দুর্বলতা ও শক্তি পরিমাপ করতে পেরেছে? উপযুক্ত সাহায্যের একটি নজির হলো, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ সমন্বিত স্বাস্থ্য প্রোগ্রাম। এটা চলছে বাংলাদেশীর নেতৃত্বে। তাদের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বাস্তবসম্মতভাবে প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন এই প্রোগ্রাম সত্যিকার অর্থে মিটিয়ে যাচ্ছে।
কিছু কিছু বৈদেশিক সাহায্যের মধ্যে প্রকৃত কল্যাণকর এবং উপকারী দিক আছে। এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, আবার আমাদের মধ্যেও দুর্বলতা আছে তাও মেনে নিতে হবে। কিন্তু আরো দুর্বলতা আমদানি করে আমরা এইসব দুর্বলতার সঙ্গে আপস করতে চাই না। আমরা এদের লালন করতে চাই না।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সেবার জন্য মৃত্যুবাণ
‘অনুপযুক্ত সাহায্যের’ একটা উদ্দেশ্য আছে। প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট গবেষকদের আপন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য বাংলাদেশের মানুষ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে অবাধে ব্যবহার করতে দেবে। আর সেটা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা সেবাদানের জন্য এক মরণ-আঘাত হতে পারে।
এই নতুন আন্তর্জাতিক প্রস্তাবের চুক্তি প্রণয়নে যিনি নিয়োজিত আছেন তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত একটি বইয়ের সমালোচনা থেকে বোঝা যায়, এই প্রস্তাব তাৎক্ষণিক কোনো ঘটনা নয়, এর শেকড় বহুদিন ধরে গজাচ্ছে। ত্রাণ মোকাবেলায় একটি আন্তর্জাতিক গ্রুপের পরিকল্পনা সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন ইংল্যান্ডের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ-এর মি. ম্যালকম সেগাল ‘সমস্ত বাস্তব সম্পদ রয়েছে সম্ভাব্য দাতা গ্রুপ’ আর আন্তর্জাতিক সংস্থার হাতে। জাতীয় সমন্বয় সংস্থা সম্পূর্ণভাবে অযথার্থ বৈদেশিক প্রযুক্তির দয়ার ওপর নির্ভরশীল। এই বৈদেশিক প্রযুক্তি পরিচালনায় আছে ‘ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ’ (তারা কোথাকার আমরা সেটা জানি), মানুষ, ডাটা প্রসেসিং ইকুইপমেন্ট (আমরা জানি কোথেকে তা আসছে) এবং এমনকি বিদেশে স্থাপিত কম্পিউটার স্টেশন। নির্ভরশীলতার জন্য এর চেয়ে উত্তম প্রেসক্রিপশন আর কী হতে পারে।
আমরা আশা করি, একদিন প্রকৃত আন্তর্জাতিকতা বাস্তবে পরিণত হবে। কিন্তু এই বইয়ের ‘আন্তর্জাতিক’ ইউএসএইড, বিশ্ব ব্যাংক এবং অপরাপর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে জাতিসংঘ টেকনিক্যাল এজেন্সির ‘আন্তর্জাতিকতাবাদ’-এর ভিতরে লুক্কায়িত আছে সাম্রাজ্যবাদ। এ কথা সবারই জানা আছে যে, ধনী পুঁজিবাদী দেশগুলো ধনী, আর পৃথিবীর গরিব দেশের মানুষ দরিদ্র। কাজেই ত্রাণকে অবশ্যই আসতে হবে পূর্বোক্ত দলের কাছ থেকে শেষোক্ত দলের নিকট। আর তা আসবে পূর্বোক্ত দলের ‘টেকনিক্যাল উপদেষ্টাদের’ পিতৃসুলভ সহায়তা সমেত।
এই প্রস্তাব বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশ একটি অনাহারক্লিষ্ট শিশু বা একটি বাস্কেট কেস। সাহায্য সংগ্রহের নামে বাংলাদেশের এইসব ভাবমূর্তির এই প্রস্তাব কায়েমি রূপ দিচ্ছে। বাংলাদেশে মেধা ও সামর্থ্য আছে। আমাদের পেশাজীবীরা মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। তাঁদের যদি কেউ স্কুলবয় মনে করে তাহলে তারা তা সহ্য করবে না। আর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে তারা যদি সুউন্নত স্বাস্থ্যের বিনিময়ে কতগুলো পরিসংখ্যান বানিয়ে দিতে চায়, তাহলে বাংলাদেশীরা তা সহ্য করবে না।
ঋণ স্বীকার: সিস্টার ম্যারি ক্লেয়ারের সহায়তা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করা হচ্ছে। সূত্র: আখড়া
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর
‘গবেষণা: উপনিবেশীকরণের একটি কৌশল’ প্রবন্ধের
তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বিশ্লেষণ—
প্রবন্ধের শুরুতে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দেখিয়েছেন যে, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ধর্ম প্রচারের মাধ্যমে যে বাণিজ্যিক আধিপত্যের সূচনা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তার চেয়েও বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে ‘ওষুধ’ ও ‘চিকিৎসা গবেষণা’। রকফেলার ফাউন্ডেশনের মতো দাতা সংস্থাগুলোর উদাহরণ টেনে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, অনুন্নত দেশের স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ আসলে তাদের নিজেদের পণ্য বিপণনের বাজার তৈরির একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশল।
গবেষণার ‘ল্যাবরেটরি’ হিসেবে বাংলাদেশ
১৯৭৭ সালের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে আমেরিকা কীভাবে একটি ল্যাবরেটরি হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, তার তীব্র সমালোচনা করেছেন লেখক। তাঁর বিশ্লেষণে এর তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য উঠে এসেছে:
- অভিজ্ঞতা অর্জন: পশ্চিমা তরুণ গবেষকদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা।
- বাণিজ্যিক স্বার্থ: বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন বাজার ও উপযোগিতা তৈরি।
- নিয়ন্ত্রণ: সাহায্য এবং প্রকল্পের দোহাই দিয়ে জাতীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে হস্তক্ষেপ।
কাঠামোগত পরনির্ভরশীলতা ও জাতীয় মেধার অপচয়
প্রবন্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় মেধার অবমূল্যায়ন। ডা. চৌধুরী দেখিয়েছেন, কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (বর্তমান আইসিডিডিআর,বি-র তৎকালীন রূপ) বা ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউটের প্রস্তাবগুলোতে স্থানীয় বিজ্ঞানীদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রাখা হয়নি। বরং তাদের রাখা হয়েছে কেবল মাঠ পর্যায়ের কর্মী বা ডাটা সংগ্রহের কাজে। এটি গবেষণার ক্ষেত্রে একটি ‘মনোপলি’ বা একচেটিয়া অধিকার তৈরি করে, যা স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠানের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
গবেষণার নৈতিকতা ও মানবদেহে পরীক্ষা
প্রবন্ধের সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটি ছিল মানবদেহের ওপর টিকার পরীক্ষা। আমেরিকায় যা প্রাণীর ওপর করা হয়, বাংলাদেশে তা সরাসরি মানুষের ওপর প্রয়োগের প্রবণতাকে তিনি ‘ব্যক্তির পবিত্র অধিকার’ লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পুষ্টিহীনতাকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হিসেবে দেখার যে ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি পশ্চিমা গবেষকদের মধ্যে ছিল, লেখক অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে তা উন্মোচন করেছেন।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা
ডা. চৌধুরী স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বিভক্তিকে বিশ্বব্যাংক ও ইউএসএইড-এর ‘বিশেষজ্ঞ পরামর্শের’ বিষময় ফল হিসেবে দেখেছেন।
তিনি উল্লেখ করেছেন যে, গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বয় নষ্ট করে পৃথক কাঠামো তৈরির ফলে অর্থব্যয় বাড়লেও সাধারণ মানুষের সেবা প্রাপ্তি সহজ হয়নি। ল্যাপোরোস্কোপের মতো ব্যয়বহুল ও উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্র গ্রামীণ হেলথ সেন্টারে স্থাপনকে তিনি ‘অনুপযুক্ত প্রযুক্তির জোরপূর্বক চাপ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর এই লেখাটি কেবল একটি প্রবন্ধ নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ইশতেহার। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, প্রকৃত সাহায্য আর ‘বিনিয়োগকৃত সাহায্য’ এক নয়।
তাঁর মতে, বাংলাদেশ কোনো ‘বাস্কেট কেস’ নয়, বরং এ দেশের মেধা ও সামর্থ্য আছে। গবেষণার নামে কোনো বিদেশি শক্তির কাছে দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ও সার্বভৌমত্ব তুলে দেওয়া আত্মঘাতী। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর লেখাটির তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বিশ্লেষণ করেছেন: এফ. আর ইমরান

