আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্রকে সভ্যতার শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক অলঙ্কার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আব্রাহাম লিংকনের সেই বিখ্যাত সংজ্ঞা—“Government of the people, by the people, for the people”—শুনে মনে হয় এটিই মুক্তির একমাত্র পথ। কিন্তু সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, নিয়মিত নির্বাচন সত্ত্বেও রাষ্ট্রযন্ত্র অনেক সময় জনবিচ্ছিন্ন ও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।
গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর থেকেই জন্ম নিচ্ছে ‘কর্তৃত্ববাদী গণতন্ত্র’ (Authoritarian Democracy)। ফলে প্রশ্ন জাগে, গণতন্ত্র কি আসলেই জনগণের ক্ষমতায়ন করে, নাকি এটি ক্ষমতা কুক্ষিগত করার একটি আইনি ঢাল মাত্র?
মেধাতন্ত্রের অনুপস্থিতি ও অযোগ্যতার জয়জয়কার
গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক ত্রুটি হলো এটি গুণের চেয়ে সংখ্যাকে প্রাধান্য দেয়। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর ‘দ্য রিপাবলিক’ গ্রন্থে গণতন্ত্রের তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন, একটি জাহাজ চালানোর দায়িত্ব যেমন অভিজ্ঞ নাবিকের ওপর থাকা উচিত, রাষ্ট্রের দায়িত্বও তেমনি থাকা উচিত প্রজ্ঞাবান দার্শনিকদের হাতে। কিন্তু গণতন্ত্রে বিশেষজ্ঞের মত আর সাধারণ আবেগপ্রবণ মানুষের মতের মূল্য সমান।
নির্বাচনে জেতার জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার জ্ঞান নয়, বরং জনতাকে আবেগপ্রবণ করার ক্ষমতা (Demagoguery বা জনতুষ্টিবাদ) বেশি প্রয়োজন হয়। ফলে একজন দূরদর্শী অর্থনীতিবিদের চেয়ে একজন সুবক্তা ও পপুলিস্ট নেতা বেশি ভোট পান। মহামতি অ্যারিস্টটল গণতন্ত্রকে একটি ‘ভ্রষ্ট শাসনব্যবস্থা’ (Perverted Form) হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন, যেখানে শাসকরা সাধারণের মঙ্গলের চেয়ে নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখে।
স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা ও সংস্কারবিমুখতা
গণতন্ত্রের ৫ বছরের নির্বাচনী চক্র রাষ্ট্রকে একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘নির্বাচনী মোড’-এ বন্দি করে ফেলে। যে কোনো বড় পরিবর্তনের ফলাফল আসতে ১০-১৫ বছর সময় লাগে। কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকারগুলো এমন কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে চায় না যা তাদের জনপ্রিয়তা কমিয়ে দেয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শিক্ষা সংস্কার বা কঠোর কর নীতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ভালো হলেও, তাৎক্ষণিক জনরোষের ভয়ে রাজনৈতিক দলগুলো তা এড়িয়ে চলে।
বড় কোম্পানিগুলো গণতান্ত্রিক নয়। তারা চলে দক্ষতার ভিত্তিতে। অথচ রাষ্ট্রকে এমন এক ব্যবস্থায় চালানো হয় যেখানে নীতি নির্ধারণের চেয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। ফরাসি দার্শনিক জাঁ-জ্যাক রুশো বলেছিলেন, “ইংরেজ জনগণ মনে করে তারা স্বাধীন, কিন্তু বাস্তবে তারা কেবল নির্বাচনের সময়ই স্বাধীন; প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার পর তারা আবার শাসিত বা পরোক্ষভাবে ‘পরাধীন’ হয়ে পড়ে।”
|
উন্নয়ন বনাম প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের গত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা একটি জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে। এক টানা শাসনক্ষমতায় থাকার ফলে পদ্মা সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা মেট্রোরেলের মতো বড় বড় মেগা প্রকল্প একযোগে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে, যা ৫ বছরের ছোট মেয়াদে করা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু এই দীর্ঘমেয়াদী শাসনের অন্ধকার দিকটি হলো—জবাবদিহিতার অভাব।
দুর্নীতির দুষ্টচক্র: যখন একটি দল দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকে এবং তাদের হটানোর কোনো কার্যকর গণতান্ত্রিক পথ থাকে না, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ঢুকে পড়ে। উন্নয়ন তখন জনকল্যাণের চেয়ে শাসকগোষ্ঠীর সম্পদ আহরণের উপায়ে পরিণত হয়। ফলে দৃশ্যমান অবকাঠামো বাড়লেও প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা ধসে পড়ে।
পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্রের গোপন আঁতাত
ফরাসি বিপ্লব পরবর্তী রাজনৈতিক দর্শনে দেখা যায়, উদীয়মান ব্যবসায়ী শ্রেণি রাজতন্ত্র ভেঙে গণতন্ত্র চেয়েছিল যাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ না হয়ে খণ্ডিত থাকে। এতে ব্যবসায়ীদের পক্ষে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। আধুনিক গণতন্ত্রে নির্বাচন মানেই কোটি কোটি টাকার খেলা।
নির্বাচনী বিনিয়োগ: রাজনীতিবিদরা নির্বাচনের জন্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ফাণ্ড নেন। ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই ঋণের বোঝা মেটাতে তারা জনস্বার্থের বদলে কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থাকেন। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রেক্ষাপটে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, সরকার বদলালেও পর্দার আড়ালের সেই সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা ‘অলিগার্ক’রা অপরিবর্তিতই থেকে যায়।
জনমতের বিকৃতি ও ‘টাইরানি অফ দ্য মেজরিটি’
গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতই শেষ কথা। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত সবসময় সঠিক হয় না। জন স্টুয়ার্ট মিল একে বলেছিলেন “Tyranny of the Majority” বা সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার।
যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কোনো ভুল বা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে, তবে গণতন্ত্র তাকেই বৈধতা দেয়।
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে মানুষের আবেগকে ম্যানিপুলেট করা যতটা সহজ হয়েছে, তাতে ‘জনমত’ অনেক ক্ষেত্রেই কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সহজ হয়ে গেছে।
গণতন্ত্রের পুনর্মূল্যায়ন
গণতন্ত্র কেন ভেঙে পড়ে? কারণ এটি মানুষের সহজাত দুর্বলতা—লোভ, আবেগ এবং স্বার্থপরতাকে শাসন করার বদলে সেগুলোকে ভোটে রূপান্তর করার সুযোগ দেয়। এটি কেবল তখনই কাজ করতে পারে যখন দেশে শক্তিশালী বিচার বিভাগ, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সুশিক্ষিত নাগরিক সমাজ থাকে।
উইনস্টন চার্চিল একবার বলেছিলেন, “গণতন্ত্র হলো নিকৃষ্টতম শাসনব্যবস্থা, তবে অন্য যেসব ব্যবস্থা এ পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়েছে, সেগুলোর চেয়ে এটি উন্নত।” অর্থাৎ গণতন্ত্র নিখুঁত নয়, এটি একটি ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা যা ক্রমাগত সংশোধনের দাবি রাখে। একে পবিত্র ও অভ্রান্ত মনে না করে বরং এর ভেতরে মেধাতন্ত্রের (Meritocracy) সমন্বয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে এটি বারবার ব্যর্থ হতে বাধ্য।

