দক্ষিণ চীন সাগর বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলগুলোর একটি। গত এক দশকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু মধ্যপ্রাচ্য বা পূর্ব ইউরোপ থেকে ক্রমশ সরে এসে দক্ষিণ এশিয়ার এই কৌশলগত জলসীমায় স্থিতি নিয়েছে।
মার্কিন সামরিক নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা এখন একটি সাধারণ প্রশ্নে উদ্বিগ্ন: দক্ষিণ চীন সাগরে কি আসলেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অঞ্চলটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব, চীনের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানের একটি বহুমাত্রিক সমীকরণ সামনে আসে।
৩ ট্রিলিয়ন ডলারের জলপথ: কেন এই সাগর এত গুরুত্বপূর্ণ?
দক্ষিণ চীন সাগর কেবল একটি জলভাগ নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রধান ধমনী। প্রতি বছর এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে ৩ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে, যা বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তবে এই বিশাল জলসীমার মালিকানা নিয়ে চীন এবং তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর (যেমন ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই ও তাইওয়ান) মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
- জ্বালানি করিডোর: পারস্য উপসাগর থেকে তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই পথেই জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানের মতো প্রধান অর্থনীতিগুলোতে পৌঁছায়।
- প্রাকৃতিক সম্পদ: এই সাগরের তলদেশে আনুমানিক ১১ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং ১৯০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
- সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তি: এই অঞ্চলের ঠিক পাশেই অবস্থিত তাইওয়ান, যা বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত মাইক্রোচিপ বা সেমিকন্ডাক্টরের ৯০%-এর বেশি উৎপাদন করে। এই জলসীমার নিয়ন্ত্রণ হারানোর অর্থ হলো বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতের নিয়ন্ত্রণ হারানো।
চীনের ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ এবং কৃত্রিম দ্বীপের সামরিকায়ন
ঐতিহাসিক দাবির অজুহাত তুলে চীন এই সাগরের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা নিজেদের বলে দাবি করে। ১৯৩০-এর দশকের কিছু বিতর্কিত মানচিত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ (Nine-dash line) নীতিকে ২০১৬ সালে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালত (PCA) অবৈধ ঘোষণা করলেও বেইজিং তা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে।
নিজেদের দাবিকে বাস্তবে রূপ দিতে চীন এক অভিনব ও আগ্রাসী কৌশল গ্রহণ করেছে। তারা সাগরের প্রবাল প্রাচীর এবং বালুচরগুলো ড্রেজিং করে বালি ভরাট করার মাধ্যমে বিশাল বিশাল কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করেছে এবং সেখানে অত্যাধুনিক রাডার এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ফাইটার জেট ওঠানামার জন্য দীর্ঘ রানওয়ে, সামরিক এবং নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ নোঙর করার জন্য গভীর সমুদ্র বন্দরে রূপান্তরিত করেছে।
বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন “বাস্তবতা পরিবর্তন করার কৌশল” (Creating facts on the ground)। কোনো আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ছাড়াই চীন কার্যত পুরো সাগরের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে।
সুপারপাওয়ারদের সংঘাত ও প্রক্সি যুদ্ধের ঝুঁকি
দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধে সরাসরি পক্ষ আঞ্চলিক দেশগুলো হলেও এর অন্যতম প্রধান অনুঘটক যুক্তরাষ্ট্র। ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতির অংশ হিসেবে মার্কিন নৌবাহিনী নিয়মিত এই অঞ্চলে টহল দেয়। ফিলিপাইন ও তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্কের কারণে এখানে যেকোনো সংঘর্ষ বড় আকার ধারণ করতে পারে।
বিশেষ করে ফিলিপাইন-যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী, ফিলিপাইনের জাহাজ বা সেনাবাহিনীর ওপর সশস্ত্র হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য। অন্যদিকে, চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ হিসেবে দাবি করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিয়ে আসছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে সামরিক সহায়তা দিয়ে থাকে। ফলে দক্ষিণ চীন সাগর বা তাইওয়ানকে ঘিরে যেকোনো উত্তেজনা সহজেই দুই পরাশক্তির সরাসরি সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
রাশিয়ার ক্রিমিয়া মডেল এবং বৈশ্বিক নিষ্ক্রিয়তা
অনেকে দক্ষিণ চীন সাগরের পরিস্থিতিকে ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের সাথে তুলনা করেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন রাশিয়ার প্রাথমিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি, তখন মস্কো ২০২২ সালে পুরো ইউক্রেনে আক্রমণ করার সাহস পায়। ঠিক একইভাবে, দক্ষিণ চীন সাগরে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি এবং প্রতিবেশীদের ওপর চড়াও হওয়ার পরও চীনের বিরুদ্ধে বড় কোনো বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর পরিণতি আসেনি। আন্তর্জাতিক মহলের এই নিষ্ক্রিয়তা বেইজিংকে আরও বড় পদক্ষেপের দিকে উৎসাহিত করছে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি সত্যিই সম্ভব?
দক্ষিণ চীন সাগরে একটি আকস্মিক সামরিক ভুল বোঝাবুঝি (যেমন আকাশসীমায় দুটি ফাইটার জেটের সংঘর্ষ বা সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজের ধাক্কা) থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে, একে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ বলার চেয়ে একটি “শীতল যুদ্ধ” (Cold War) বা তীব্র অর্থনৈতিক-সামরিক প্রতিযোগিতা বলাই বেশি যৌক্তিক।
একদিকে, তাইওয়ান বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরি করে, যা বৈশ্বিক প্রযুক্তির প্রাণ। তাইওয়ান বা দক্ষিণ চীন সাগরের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে চলে গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় নামবে, তা ঠেকাতে আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য হতে পারে।
অন্যদিকে, আধুনিক পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়ানোর ভয়াবহতা ভালো করেই জানে। চীন ও আমেরিকার অর্থনীতি একে অপরের সাথে এত গভীরভাবে জড়িত যে, একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ দুই দেশেরই অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেবে। এছাড়া পারমাণবিক অস্ত্রের ভারসাম্য (MAD – Mutually Assured Destruction) সরাসরি যুদ্ধকে স্তিমিত করে রাখে।
ফলে, একটি সরাসরি বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে এখানে এক ধরণের ‘শীতল যুদ্ধ’ (Cold War) বা প্রক্সি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে পরিস্থিতি শান্ত থাকার কোনো লক্ষণ নেই। দক্ষিণ চীন সাগর এখন এমন এক বারুদের স্তূপ, যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে যেকোনো ছোট স্ফুলিঙ্গ একটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধ এবং বিশ্বব্যাপী তীব্র অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট।

