ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় নিউমার্কেটের কাছে একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও ৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে নিহতদের সবাই বাংলাদেশের নাগরিক বলে জানানো হয়েছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাত পৌনে ২টার দিকে মির্জা গালিব স্ট্রিটের পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে ভবনের বিভিন্ন অংশ। এতে ভেতরে থাকা অনেকেই বের হওয়ার সুযোগ না পেয়ে আটকা পড়েন।
নিহতদের অধিকাংশই চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তারা নিউমার্কেট এলাকার ‘হোটেল শিখা ইন’-এর তৃতীয় তলায় অবস্থান করছিলেন।
সরু প্রবেশপথে বেড়ে যায় বিপদ
হোটেলের একজন আবাসিক অতিথি মো. রফিকুল ইসলাম জানান, রাত পৌনে ২টার দিকে আগুন লাগার পর দ্রুত পুরো ভবনে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। সরু প্রবেশপথ এবং পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
আগুন লাগার পর অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ঘন ধোঁয়া ও ভবনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়ে।
ঘটনাস্থল কলকাতা দমকল বাহিনীর সদর দপ্তরের কাছাকাছি হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত সেখানে পৌঁছান। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে ভবনের ভেতরে উদ্ধার অভিযান চালানো হয়।
দমকল বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে তদন্ত প্রয়োজন।
চিকিৎসার জন্য গিয়ে মর্মান্তিক পরিণতি
কলকাতার নিউমার্কেট এলাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। চিকিৎসা, কেনাকাটা ও অন্যান্য প্রয়োজনে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বহু মানুষ এই এলাকার হোটেলগুলোতে অবস্থান করেন।
ঘটনাস্থলের ওই ভবনেও বিভিন্ন নামে আরও কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পর্যটক ও রোগীদের একটি বড় অংশ অবস্থান করেন বলে জানা গেছে।
ফলে অগ্নিকাণ্ডের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—ভবনটিতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে অতিথিদের দ্রুত বের করে আনার মতো ব্যবস্থা সেখানে ছিল কি না।
আহত ৮, চলছে চিকিৎসা
অগ্নিকাণ্ডে গুরুতর আহত ৮ জনকে দ্রুত উদ্ধার করে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ একাধিক চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণ করছেন।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবনটিতে মোট কতজন অবস্থান করছিলেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে উদ্ধার অভিযান ও পরিচয় শনাক্তের কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের সংখ্যা নিয়ে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।
অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন
এই ঘটনা শুধু একটি হোটেলে আগুন লাগার ঘটনা নয়; এটি পর্যটক ও রোগীদের জন্য ব্যবহৃত আবাসিক ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিশেষ করে যেসব ভবনে নিয়মিত বিদেশি নাগরিক, রোগী ও পর্যটকেরা থাকেন, সেখানে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট আছে কি না, জরুরি বহির্গমন পথ খোলা ও ব্যবহারযোগ্য কি না এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম কার্যকর অবস্থায় আছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।
একটি ভবনে আগুন লাগা সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সরু প্রবেশপথ, অপর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা এবং দ্রুত ধোঁয়ায় ভবন ভরে গেলে সামান্য আগুনও প্রাণঘাতী বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।
কলকাতার এই মর্মান্তিক ঘটনায় ৯ বাংলাদেশির প্রাণহানি তাই শুধু একটি পরিবারের নয়, দুই দেশের মানুষের জন্যই গভীর শোকের ঘটনা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে আবাসিক হোটেলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোরভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনে দিয়েছে।

