আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা শুধু একটি ধর্মীয় শেষকৃত্য ছিল না, বরং তা ইরানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বার্তা প্রদর্শনের একটি সুসংগঠিত মঞ্চে পরিণত হয়েছিল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজায় তাঁর তিন ছেলে (মাসউদ, মেইসাম ও মুস্তফা) এবং বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধানসহ কোটি মানুষের ঢল নেমে আসে।
এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে তেহরান একদিকে অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও জনসমর্থন প্রদর্শন করেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীকী রাজনৈতিক ভাষ্যও বিশ্বকে পাঠিয়েছে। কোটি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং ট্রাম্পকে হত্যার সরাসরি স্লোগান বিশ্বকে এই বার্তাই দেয় যে—নেতাকে হত্যা করা গেলেও ইরানের আদর্শ ও বিপ্লবী চেতনাকে দমন করা অসম্ভব।
|
জানাজায় শিয়া সংস্কৃতির গভীর ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করে মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিশোধের তুলে ধরেছে। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় ওড়ানো লাল পতাকা এবং ‘হে হোসেনের প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা’ ও ‘হে খামেনির প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা’—এই স্লোগানগুলোর মাধ্যমে খামেনির মৃত্যুকে কারবালার ঐতিহাসিক ত্যাগের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

লাল পতাকা, মুষ্টিবদ্ধ হাতের ছবি এবং প্রতিশোধমূলক স্লোগানের ব্যবহার মূলত খামেনির মৃত্যুকে একটি সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনার বাইরে নিয়ে গিয়ে ‘শহীদত্ব’ ও ‘সংগ্রামের ধারাবাহিকতা’র কাঠামোয় উপস্থাপন করে। যা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার প্রক্রিয়াকে তাদের সমর্থকদের কাছে বৈধ ও পবিত্র করে তুলবে।
ইরান এই জানাজাকে একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেছে, যেখানে আগত বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সামনে পবিত্র কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে ভবিষ্যতের সম্পর্কের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
যেমন—সৌদি আরবের সামনে বদর যুদ্ধের আয়াত পড়ে রিয়াদের মার্কিনপন্থী ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের (তালেবান) মতো মিত্রদের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিজয়ের আয়াত শুনিয়ে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সাথে, সংকটের সময় পাশে না থাকা তুরস্ক বা ইরাকের কুর্দি গোষ্ঠীকে পরোক্ষভাবে খোঁচা দিয়ে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তারা কার আচরণ কেমন ছিল তা ভুলে যায়নি।

জানাজায় লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইয়েমেনের হুতিদের মতো প্রতিরোধ যোদ্ধাদের শীর্ষ প্রতিনিধিদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ‘অক্ষ অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ বলয় এখনো ভাঙেনি।
পাশাপাশি, নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে ইসরায়েলি হুমকি থেকে বাঁচাতে জনসমক্ষে না এনে আড়ালে রাখার কঠোর সিদ্ধান্তটি এই বার্তা দেয় যে, ইরান অত্যন্ত বাস্তবসম্মত উপায়ে তাদের নতুন নেতৃত্বকে সুরক্ষিত রাখছে এবং যেকোনো মূল্যে তারা শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রস্তুত।
সব মিলিয়ে খামেনির জানাজা বিশ্বকে যে বার্তা দিয়েছে তা দ্বিমুখী। একদিকে, ইরান চরম সংকটের মুখোমুখি হলেও মার্কিন বা ইসরায়েলি চাপের মুখে আত্মসমর্পণ করেনি, বরং শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে- রাষ্ট্রীয় স্থিতি, ধর্মীয়-রাজনৈতিক ঐক্য এবং প্রতিরোধের শক্তিশালী চিত্র তুলে ধরেছে ইরান, অন্যদিকে এটি দেখিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে ধর্ম, রাজনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা গভীরভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

