বিশেষ প্রতিবেদন
কয়েক হাজার টাকার ঋণ এখন আর ব্যাংকের শাখায় গিয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা করার বিষয় নয়। মোবাইল ফোনে কয়েকটি ধাপ পার হলেই ৫০০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে ডিজিটাল ঋণের এই বিস্তার আর পরীক্ষামূলক পর্যায়ে নেই সিটি ব্যাংক ও বিকাশের ন্যানো লোনই এর বড় প্রমাণ। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে চালুর পর জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত এই সেবায় ৩৫ লাখের বেশি বিকাশ ব্যবহারকারী ঋণ নিয়েছেন এবং মোট বিতরণ ছাড়িয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে ঋণ হিসাবের সংখ্যা ৩ কোটি ১৯ লাখ ছাড়িয়েছে।
সংখ্যাগুলো প্রথম দেখায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বড় সাফল্যের গল্প। কিন্তু একটু গভীরে গেলে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে এই ঋণের এত দ্রুত বিস্তার কি শুধু মানুষের প্রয়োজন মেটাচ্ছে, নাকি ভবিষ্যতে ছোট ছোট ঋণ মিলিয়ে বড় ঋণঝুঁকিও তৈরি করতে পারে? কারণ একজন গ্রাহক গড়ে নয়বারের বেশি এই ঋণ নিয়েছেন। বারবার ঋণ নেওয়া অবশ্যই খারাপ নয়। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পণ্য কিনে বিক্রি করার জন্য কয়েক সপ্তাহ পরপর ঋণ নিয়ে সময়মতো শোধ করলে সেটি কার্যকর ব্যবসায়িক অর্থায়ন। কিন্তু একই মানুষ যদি আগের ঋণের কিস্তি মেটাতে নতুন ঋণ নেন, তাহলে বাইরে থেকে একই ‘রিপিট লোন’ দেখা গেলেও ভেতরের আর্থিক অবস্থাটা সম্পূর্ণ আলাদা। তাই ন্যানো লোনের সাফল্য শুধু কত টাকা বিতরণ হলো বা কতজন গ্রাহক ঋণ নিলেন এ দিয়ে বিচার করলে চলবে না।
১০ হাজার কোটি টাকার পর আসল হিসাবটা কী?
সিটি ব্যাংক-বিকাশের ন্যানো লোনে গড় ঋণের আকার প্রায় ৩ হাজার টাকা এবং মাসে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণ হচ্ছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট বিতরণের বিপরীতে প্রায় ৫৩ কোটি টাকা নন-পারফর্মিং বা রাইট-অফ হয়েছে, যা মোট বিতরণের প্রায় ০.৫ শতাংশ।
০.৫ শতাংশের এই সংখ্যা নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। কিন্তু এটিকে সরাসরি ‘মাত্র ০.৫ শতাংশ ঋণখেলাপি’ বলে পুরো বাজারের স্বাস্থ্য নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। কারণ NPL বা রাইট-অফের হিসাব একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঋণের অবস্থা দেখায়; একজন গ্রাহক কতবার ঋণ নিয়েছেন, তার অন্য কোথাও ঋণ আছে কি না, নতুন ঋণটি আয় তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে নাকি পুরোনো ঋণ শোধে যাচ্ছে এসব প্রশ্নের উত্তর এই একটি সংখ্যা দেয় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ১০ হাজার কোটি টাকা বিতরণ মানেই ১০ হাজার কোটি টাকা এখনো গ্রাহকদের হাতে বকেয়া আছে এমনও নয়। এখানে মোট বিতরণ এবং বর্তমান আউটস্টান্ডিং ঋণের পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।
বিকাশের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এই ঋণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া হয় এবং গ্রাহক অ্যাপের মাধ্যমেই ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধ করেন। বর্তমানে যোগ্য গ্রাহক ৫০০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। অর্থাৎ এটি অনানুষ্ঠানিক ধার নয়; বরং ডিজিটাল চ্যানেলে দেওয়া আনুষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ।
তাহলে ঋণগ্রহীতার পুরো ছবি কোথায়?
এখানে একটি ভুল ধারণা আগে সরিয়ে রাখা দরকার। বাংলাদেশে ঋণগ্রহীতার তথ্য যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই এটি ঠিক নয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো বা সিআইবি রয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সিআইবিতে তথ্য দেওয়ার সীমা ৫০ হাজার টাকা থেকে নামিয়ে ১ টাকা করা হয়। অর্থাৎ ১ টাকা বা তার বেশি বকেয়া থাকা ঋণের তথ্যও সিআইবি অনলাইন সিস্টেম-এ রিপোর্ট করার নির্দেশ রয়েছে।
তাই বিকাশ অ্যাপ দিয়ে নেওয়া সিটি ব্যাংকের ন্যানো লোনকে শুধু ডিজিটাল হওয়ায় ‘সিআইবির বাইরে থাকা ঋণ’ বলা ঠিক হবে না। ঋণদাতা এখানে ব্যাংক, আর বিকাশ হচ্ছে সেই ঋণ দেওয়ার ডিজিটাল চ্যানেল। আসল প্রশ্ন অন্য জায়গায় একজন মানুষের সব ধরনের ধার একই জায়গায় কতটা সমন্বিতভাবে দেখা যাচ্ছে?
কারণ ব্যাংকঋণের বাইরে বাংলাদেশে বড় একটি ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা রয়েছে। এ খাতে ওভারল্যাপিং লোন বা একই ব্যক্তির একাধিক প্রতিষ্ঠানে ঋণ নেওয়ার সমস্যা দীর্ঘদিনের। এই কারণেই ক্ষুদ্রঋণ খাতের জন্য আলাদা এমএফ-সিআইবি তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এমআরএ ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে এমএফ-সিআইবি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়; ২০২৪ সালে এটি চালু হওয়ার পর ক্ষুদ্রঋণ খাতে গ্রাহকের ঋণতথ্য ডিজিটালভাবে ব্যবস্থাপনার কাঠামো তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টেও ওভারল্যাপিং ইন্ডিভিজুয়াল লোন কমানো, ক্রেডিট রিস্ক হ্রাস এবং রেসপন্সিবল লেন্ডিং উৎসাহিত করাকে এমএফ-সিআইবি-এর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের ঋণতথ্য ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। ব্যাংক খাতের সিআইবি এবং ক্ষুদ্রঋণ খাতের এমএফ-সিআইবি আলাদা কাঠামো। ২০২৪ সালের একটি বিশ্লেষণেও উল্লেখ করা হয়েছিল, ব্যাংকিং খাতের সিআইবি ও এমএফ-সিআইবি-এর মধ্যে আন্তঃসংযোগ না থাকলে একটি ব্যাংকের ঋণ যাচাইয়ে কোনো এমএফআই-এর ঋণ এবং উল্টোভাবে কোনো এমএফআই-এর যাচাইয়ে ব্যাংকঋণ ধরা নাও পড়তে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশে কারও ঋণের তথ্য কোথাও নেই। বরং সমস্যা হলো তথ্য আছে, কিন্তু সব তথ্য একই সময়ে একই জায়গায় দেখা যাচ্ছে কি না। ধরুন, একজন গ্রাহকের সিটি ব্যাংকের ডিজিটাল ঋণ ৫ হাজার টাকা, একটি এমআরএ-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্রঋণ ১০ হাজার টাকা এবং এর বাইরে আরও ৫ হাজার টাকার কোনো অনানুষ্ঠানিক ধার রয়েছে। তখন তার মোট দায় ২০ হাজার টাকা হলেও কোনো একটি ঋণদাতার ঝুঁকি মূল্যায়নে সবগুলো দায় একইভাবে দৃশ্যমান হবে এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। শেষের অনানুষ্ঠানিক ধারটির তথ্য তো কোনো ক্রেডিট ব্যুরোতেই নাও থাকতে পারে।
ছোট ঋণ, কিন্তু বড় ঋণচক্রের সম্ভাবনা
এখানেই ন্যানো লোনের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং ঝুঁকি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। ছোট ঋণের জন্য জামানত বা কাগজপত্রের প্রয়োজন নেই, অনুমোদন দ্রুত এবং টাকা সরাসরি ডিজিটাল মাধ্যমে পাওয়া যায়। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য এটি বড় সুবিধা। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হঠাৎ পণ্য কেনার টাকা না পেলে ৩ হাজার বা ৫ হাজার টাকার ঋণ তার ব্যবসা সচল রাখতে পারে। কিন্তু একই সুবিধা যদি নিয়মিত আয় না থাকা একজন মানুষকে বারবার নতুন ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেয়, তখন ঋণটি আর শুধু জরুরি অর্থের বিকল্প থাকে না, এটি দৈনন্দিন নগদ ঘাটতি সামলানোর স্থায়ী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
এই পার্থক্যটি বোঝার জন্য ‘রিপিট বোরোয়িং’ বা বারবার ঋণ নেওয়ার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। একজন গ্রাহক বারবার ঋণ নিচ্ছেন মানেই তিনি ঝুঁকিপূর্ণ এমন সিদ্ধান্তও ভুল। বরং দেখতে হবে, আগের ঋণ থেকে বেরিয়ে আসার পর তিনি নতুন ঋণ নিচ্ছেন, নাকি আগের ঋণ পুরোপুরি শোধ করার আগেই নতুন ঋণ প্রয়োজন হচ্ছে। দ্বিতীয় পরিস্থিতি যদি ব্যাপক হয়, তাহলে কম খেলাপির হার সত্ত্বেও ভবিষ্যৎ ঋণচাপের একটি সংকেত তৈরি হতে পারে।
এখানে ন্যানো লোনের মেয়াদ ও খরচও গুরুত্বপূর্ণ। বিকাশের তথ্য অনুযায়ী, ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহকভেদে সুদের হার প্রযোজ্য এবং ঋণ প্রক্রিয়াকরণ ফি ০.৫৭৫ শতাংশ। কয়েক হাজার টাকার স্বল্পমেয়াদি ঋণে শতাংশের হিসাবের চেয়ে গ্রাহকের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, সব ফি ও সুদ মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত কত টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে এবং সেই টাকা তার আয় বা নগদ প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
ধরুন, একজন ছোট দোকানি ৫ হাজার টাকা নিয়ে পণ্য কিনলেন, কয়েক দিনের মধ্যে বিক্রি করে ঋণ শোধ করলেন এবং লাভও করলেন। এই ঋণ তার ব্যবসার মূলধন। কিন্তু আরেকজন একই ৫ হাজার টাকা নিলেন আগের ঋণের কিস্তি মেটাতে। তার নতুন ঋণ কোনো নতুন আয় তৈরি করল না। বরং পুরোনো দায়কে সামনের দিকে ঠেলে দিল। এই দুই গ্রাহকের ঋণ নেওয়ার সংখ্যা একই হতে পারে, কিন্তু ঝুঁকি এক নয়।
এখন নজর দিতে হবে ‘কতজন ঋণ পেল’ থেকে ‘কেন ঋণ নিল’-এ
ডিজিটাল ঋণের পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে ঋণের ব্যবহার ও পুনরায় ঋণ নেওয়ার ধরন বোঝা। কতজন গ্রাহক প্রথমবার ঋণ নিচ্ছেন, কতজন নিয়মিত পুনরায় ঋণ নিচ্ছেন, কতজন আগের ঋণ পুরোপুরি শোধ করার পর নতুন ঋণ নিচ্ছেন এবং কতজনের একাধিক প্রতিষ্ঠানে একই সময়ে দায় রয়েছে এসব তথ্য ঋণের প্রকৃত স্বাস্থ্য বোঝার ক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর।
একই সঙ্গে শুধু ঋণদাতার খেলাপি কম কি না সেটিও যথেষ্ট নয়। একজন গ্রাহকের আয়, লেনদেনের প্রবাহ, আগের ঋণ পরিশোধের ইতিহাস এবং অন্য ঋণদাতার কাছে তার দায় এসব একসঙ্গে বিবেচনা করে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা যত বাড়বে, ডিজিটাল ঋণ তত বেশি দায়িত্বশীল হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি এবং এমআরএ-র এমএফ-সিআইবি ইতিমধ্যে এই তথ্যভিত্তিক ঋণব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, এই দুই ব্যবস্থার তথ্য কতটা কার্যকরভাবে সমন্বয় করা যায় এবং অনানুষ্ঠানিক ধারকে কীভাবে ঝুঁকি বিশ্লেষণের আওতায় আনা যায়।
কারণ ন্যানো লোনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আসলে ৩ হাজার বা ৫ হাজার টাকার ঋণ নয়। প্রশ্ন হলো, একজন মানুষের আয় যত দ্রুত বাড়ছে, তার মোট ঋণ কি তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে? যদি ছোট ঋণ একজন মানুষকে আয় করার সুযোগ দেয়, তাহলে এটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু যদি নতুন ঋণ দিয়ে পুরোনো ঋণ সামলানোর প্রবণতা বাড়ে, তাহলে আজকের ৫ হাজার টাকার সহজ ঋণ আগামী দিনের বড় ঋণচাপের ভিত্তিও হতে পারে। বাংলাদেশের ডিজিটাল ঋণবাজার এখন যে গতিতে বাড়ছে, তাই পরবর্তী সাফল্যের মাপকাঠি শুধু ১০ হাজার কোটি টাকা বিতরণ নয় বরং এই টাকার কতটা মানুষের আয় ও সক্ষমতা বাড়িয়েছে, আর কতটা শুধু এক ঋণ থেকে আরেক ঋণে গিয়েছে, সেটিই হওয়া উচিত।

