বিশেষ প্রতিবেদন
শেয়ারবাজারে টাকা ঢোকানোর আগে একজন বিনিয়োগকারী খুব সহজ একটি প্রশ্ন করেন ঝুঁকি নিয়ে শেয়ার কিনে আমি কতটা বেশি আয় করতে পারব? এই প্রশ্নের উত্তর বদলে যায় যখন সরকারি ট্রেজারি বিল থেকেই তুলনামূলক ভালো রিটার্ন পাওয়া যায়। বাংলাদেশে ৩ আগস্ট ২০২৬-এর নিলামে ৯১ দিনের ট্রেজারি বিলের কাট-অফ ইয়িল্ড ছিল ৯.৩০ শতাংশ, ১৮২ দিনের ৯.৫৩ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিনের ৯.৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ খুব কম ঝুঁকির একটি সরকারি সিকিউরিটিজে প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ রিটার্নের সুযোগ থাকলে শেয়ারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগ করতে একজন বিনিয়োগকারী কতটা অতিরিক্ত রিটার্ন চাইবেন সেটিই হয়ে ওঠে মূল প্রশ্ন।
একই টাকা, কিন্তু ঝুঁকি আলাদা
ধরুন, আপনার হাতে ১০ লাখ টাকা। একদিকে সরকারি ট্রেজারি বিল, অন্যদিকে শেয়ারবাজার। ট্রেজারি বিলে যদি প্রায় ৯.৫ শতাংশ রিটার্ন পাওয়ার সুযোগ থাকে, তাহলে বছরে প্রায় ৯৫ হাজার টাকার একটি তুলনামূলক স্থির রিটার্নের ধারণা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে শেয়ারে ১২ বা ১৩ শতাংশ রিটার্নের সম্ভাবনা থাকলেও সেখানে দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। তখন বিনিয়োগকারী স্বাভাবিকভাবেই হিসাব করবেন অতিরিক্ত ৩-৪ শতাংশ সম্ভাব্য লাভের জন্য আমি কি শেয়ারের ঝুঁকি নেব? এখানেই ট্রেজারি বিলের ইয়িল্ড শেয়ারবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ বিনিয়োগের দুনিয়ায় রিটার্নকে কখনো একা দেখা হয় না; রিটার্নের পাশে ঝুঁকির দামও বসাতে হয়।
ফাইন্যান্সের ভাষায় এই ধারণাটিকে বলা হয় রিস্ক-ফ্রি রেট বা তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত রিটার্ন। বাস্তবে কোনো সরকারি সিকিউরিটিজকে একেবারে শূন্য ঝুঁকির সম্পদ ধরে নেওয়া সব দেশের জন্য ঠিক নয়। তবু মূল্যায়ন মডেলে সরকারি সিকিউরিটিজের রিটার্নকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বেসলাইন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আসওয়াথ দামোদরনের ব্যাখ্যায়, ইক্যুইটির প্রত্যাশিত রিটার্ন গঠিত হয় রিস্ক-ফ্রি রেট, শেয়ারের ঝুঁকি এবং ইক্যুইটি রিস্ক প্রিমিয়ামের সমন্বয়ে। অর্থাৎ রিস্ক-ফ্রি রেট ওপরে উঠলে শেয়ারের জন্য বিনিয়োগকারীর কাঙ্ক্ষিত রিটার্নও সাধারণত ওপরে যায়।
সুদ বাড়লে শেয়ারের দাম কেন চাপ খায়?
এখানে বিষয়টি শুধু ‘বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করে ট্রেজারি বিল কিনছেন’ এত সরল নয়। শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের সময় ভবিষ্যতে কোম্পানি যে নগদ আয় করবে, সেটিকে বর্তমান মূল্যে হিসাব করা হয়। এই হিসাবের জন্য যে ডিসকাউন্ট রেট ব্যবহার করা হয়, তার সঙ্গে সুদের হার ও রিস্ক-ফ্রি রেটের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সুদের হার বাড়লে ভবিষ্যতের একই পরিমাণ আয় আজকের হিসাবে কম মূল্যবান হয়ে যায়। বিশেষ করে যেসব কোম্পানির বর্তমান আয় তুলনামূলক কম কিন্তু ভবিষ্যতে বড় প্রবৃদ্ধির আশা রয়েছে, তাদের ওপর এই প্রভাব বেশি পড়তে পারে। কারণ তাদের শেয়ারের বর্তমান মূল্য অনেকটাই ভবিষ্যতের আয়ের ওপর নির্ভর করে।
একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। কোনো কোম্পানি কয়েক বছর পর বড় মুনাফা করবে এই প্রত্যাশায় আজ তার শেয়ারের দাম বেশি। কিন্তু একই সময়ে বাজারে নিরাপদ সরকারি বিনিয়োগের রিটার্ন যদি ৭ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশের কাছাকাছি উঠে যায়, তাহলে ওই ভবিষ্যৎ মুনাফার জন্য বিনিয়োগকারী আগের মতো বেশি দাম দিতে চাইবেন না। কারণ তার বিকল্প বেড়েছে। দামোদরনের ডিসকাউন্ট রেট বিশ্লেষণেও দেখা যায়, রিস্ক-ফ্রি রেট ও ইক্যুইটি রিস্ক প্রিমিয়াম দুটিই শেয়ারের প্রয়োজনীয় রিটার্ন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় রিটার্ন বাড়লে একই ভবিষ্যৎ ক্যাশ ফ্লোর বর্তমান মূল্য কমে যেতে পারে।
এই প্রভাবটি আবার সব শেয়ারে সমান নয়। যেসব কোম্পানির মুনাফা স্থিতিশীল, নিয়মিত লভ্যাংশ দেয় এবং ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কম, সেগুলোর মূল্যায়নে উচ্চ সুদের চাপ একরকম। কিন্তু উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশায় যেসব কোম্পানির শেয়ার অনেকটা ভবিষ্যৎ আয়ের ওপর নির্ভর করে, সেখানে ডিসকাউন্ট রেট বাড়ার প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তাই সুদের হার বাড়ার সময় বাজারে শুধু ‘শেয়ারবাজার খারাপ হবে’ বললে পুরো গল্পটা বলা হয় না; আসলে বাজারের বিভিন্ন কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয়ের মূল্য নতুন করে হিসাব হতে থাকে।
বাংলাদেশে চাপটা কোথা থেকে আসছে?
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের শুরুতে নীতিগত সুদের হার ১০ শতাংশে রেখেছিল এবং পরে ফেব্রুয়ারি থেকে সেটি ১০ শতাংশেই বহাল ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যেও ১০ শতাংশ পলিসি রেট, ১১.৫০ শতাংশ এসএলএফ এবং ৭.৫০ শতাংশ এসডিএফ দেখানো হয়েছে। একই সময়ে ট্রেজারি বিলের ইয়িল্ডও ৯ শতাংশের ওপরে ছিল। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক তথ্য অনুযায়ী ৯১ দিনের বিলের গড় ইয়িল্ড ছিল ৯.৯৮ শতাংশ, ১৮২ দিনের ১০.২৫ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিনের ১০.৩৩ শতাংশ। পরে ৩ আগস্টের নিলামে এসব ইয়িল্ড কিছুটা কমে যথাক্রমে ৯.৩০, ৯.৫৩ ও ৯.৫৪ শতাংশে আসে। অর্থাৎ বাজারে সরকারি সিকিউরিটিজের রিটার্নের একটি শক্তিশালী বিকল্প এখনও রয়েছে, যদিও ইয়িল্ডের গতিপথ সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে।
এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ট্রেজারি বিলের ইয়িল্ড কমলেই শেয়ারবাজার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াবে এমন কোনো নিয়ম নেই। কারণ শেয়ারের দাম শুধু সুদের হার দিয়ে নির্ধারিত হয় না। কোম্পানির মুনাফা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, বিনিয়োগকারীর আস্থা, ব্যাংকিং খাতের অবস্থা, তারল্য, বিনিময় হার এবং বাজারের ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা সবই একসঙ্গে কাজ করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংক তার সাম্প্রতিক মুদ্রানীতি পর্যালোচনায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রত্যাশা স্থিতিশীল রাখতে নীতিগত অবস্থান কঠোর রাখার কথা জানিয়েছে। ফলে শেয়ারবাজারের ওপর সুদের প্রভাবকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশ থেকে আলাদা করে দেখা ঠিক হবে না।
আসল ক্ষতি শুধু টাকা সরে যাওয়ায় নয়
উচ্চ ট্রেজারি ইয়িল্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হতে পারে অপর্চুনিটি কস্ট বা বিকল্প বিনিয়োগের খরচ বেড়ে যাওয়া। একজন বিনিয়োগকারী যখন দেখেন সরকারি সিকিউরিটিজে প্রায় ৯.৫ শতাংশ রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে, তখন শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি হয়তো ৯.৫ শতাংশ নয়, তার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি প্রত্যাশিত রিটার্ন চাইবেন। কারণ শেয়ারের দামের ওঠানামা, কোম্পানির ব্যবসায়িক ঝুঁকি, বাজারের তারল্য এবং অন্যান্য অনিশ্চয়তার জন্য তাকে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই অতিরিক্ত প্রত্যাশিত রিটার্নই ইক্যুইটি রিস্ক প্রিমিয়ামের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। দামোদরনের ব্যাখ্যায়, ইক্যুইটি রিস্ক প্রিমিয়াম হলো ঝুঁকিপূর্ণ ইক্যুইটিতে বিনিয়োগের জন্য রিস্ক-ফ্রি রেটের ওপরে বিনিয়োগকারীর চাওয়া অতিরিক্ত রিটার্ন।
ফলে ট্রেজারি বিলের সুদ বাড়লে শেয়ারবাজারে নতুন টাকা আসার গতি কমতে পারে, বিশেষ করে যেসব বিনিয়োগকারী ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওতেও সরকারি সিকিউরিটিজের আকর্ষণ বাড়তে পারে। তবে এটিকে সরাসরি ‘ট্রেজারি বিল শেয়ারবাজারের টাকা কেড়ে নিচ্ছে’ বলা কিছুটা অতিরঞ্জিত হবে। কারণ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মিউচুয়াল ফান্ড বা অন্যান্য বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে নিয়ন্ত্রক বিধি, তারল্য, মেয়াদ, কর, দায়-দায়িত্ব এবং পোর্টফোলিওর প্রয়োজনও কাজ করে। অর্থাৎ এটি একটি পোর্টফোলিও অ্যালোকেশন-এর প্রশ্ন, শুধু টাকা এক বাজার থেকে অন্য বাজারে চলে যাওয়ার গল্প নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি হলো প্রত্যাশা। বাজার আজকের সুদের হার যতটা দেখে, তার চেয়ে বেশি দেখে আগামী দিনের সুদের হার কোথায় যেতে পারে। যদি বিনিয়োগকারীরা মনে করেন ট্রেজারি বিলের উচ্চ ইয়িল্ড সাময়িক এবং ভবিষ্যতে সুদের হার কমবে, তাহলে তারা শেয়ারবাজারে আগেভাগেই অবস্থান নিতে পারেন। আবার উল্টোভাবে, বর্তমান ইয়িল্ড ৯.৫ শতাংশ হলেও যদি মনে হয় এটি আরও দীর্ঘ সময় থাকবে, তাহলে শেয়ারের মূল্যায়নে চাপ দীর্ঘায়িত হতে পারে। অর্থাৎ শেয়ারবাজার অনেক সময় বর্তমান সুদের হার নয়, সুদের হারের ভবিষ্যৎ পথকে আগে থেকেই দামে অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করে।
তাই সরকারি ট্রেজারি বিলের সুদ বেশি হওয়া শেয়ারবাজারের জন্য এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি করে তবে সেটিই পুরো বাজারের ভাগ্য নির্ধারণ করে না। প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত খুব সহজ: ঝুঁকি নিয়ে শেয়ার কিনে বিনিয়োগকারী ট্রেজারি বিলের তুলনায় যথেষ্ট অতিরিক্ত রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন কি না। যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে শেয়ারবাজারে চাহিদা দুর্বল হওয়ার স্বাভাবিক কারণ তৈরি হয়। আর যদি কোম্পানিগুলোর মুনাফা দ্রুত বাড়ে, মূল্যায়ন আকর্ষণীয় হয় এবং বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে সুদের হার কমার প্রত্যাশা করেন, তাহলে উচ্চ ট্রেজারি ইয়িল্ডের মধ্যেও শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তাই বিনিয়োগকারীর জন্য সবচেয়ে কার্যকর প্রশ্ন ‘ট্রেজারি বিলের সুদ কত?’ নয়; বরং ‘এই সুদের বিপরীতে শেয়ারবাজার আমাকে কতটা অতিরিক্ত রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে?’ এই প্রশ্নের উত্তরই আসলে বলে দেয়, শেয়ারে ঝুঁকি নেওয়া এখন কতটা যুক্তিযুক্ত।

