দেশের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হলো। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ—এই তিনটি পৃথক সংস্থাকে একীভূত করে গঠিত নতুন প্রতিষ্ঠান ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ কার্যক্রম শুরু করেছে।
গত বৃহস্পতিবার সরকার এই লক্ষ্যে ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬-এর প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে। রাষ্ট্রপতির নির্দেশক্রমে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এই প্রজ্ঞাপনে সই করেন। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আইনের একটি নির্দিষ্ট ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ২০ আগস্ট তারিখ থেকেই এই আইন কার্যকর হয়েছে বলে জানানো হয়। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত তিন সংস্থার একীভূতকরণ প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক রূপ পেল।
তবে গেজেট কার্যকর হলেও নতুন কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো এখনই প্রস্তুত নয়। বিলুপ্ত হওয়া বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক এক নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন উইং ও কর্মী দল গঠনের কাজ ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হবে। তাঁর ভাষ্যমতে, গেজেট প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে এখন সব কার্যক্রম নতুন নামেই পরিচালিত হবে, আর বাকি সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির কাজ পর্যায়ক্রমে এগিয়ে নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, কয়েক মাসের প্রস্তুতির পর এই নতুন কর্তৃপক্ষের আত্মপ্রকাশে তাঁরা সন্তুষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সব ধরনের সেবা এক জায়গা থেকে পাওয়ার দাবি উঠছিল। মূলত সেই দাবিকে সামনে রেখেই এই সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, নতুন কর্তৃপক্ষকে এমনভাবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে বিনিয়োগকারীরা একটিমাত্র প্রবেশদ্বার দিয়েই সব সেবা পেতে পারেন। এতে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া আরও সুসংগঠিত, ঝামেলামুক্ত ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নতুন আইনের বিধান অনুযায়ী, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ একটি সংবিধিবদ্ধ স্বাধীন সংস্থা হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে, যার প্রধান কার্যালয় থাকবে রাজধানী ঢাকায়। প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারের অনুমোদনক্রমে দেশের ভেতরে শাখা কার্যালয় এবং বিদেশে যোগাযোগ কার্যালয়ও স্থাপন করা যাবে। প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম তদারকির জন্য একজন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সাতজন সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিচালনা কাঠামো থাকবে, যেখানে চেয়ারম্যানই হবেন সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
নতুন এই কর্তৃপক্ষের প্রধান কাজের মধ্যে থাকবে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ খাত চিহ্নিত করা, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা, বিনিয়োগের পথে থাকা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় সাধন করা।
একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিলুপ্ত হওয়া তিন সংস্থার সম্পদ, সংরক্ষিত নথিপত্র, চলমান চুক্তি, দায়-দেনাসহ যাবতীয় বিষয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরিত হবে। পাশাপাশি এসব সংস্থায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এখন থেকে নতুন কর্তৃপক্ষের অধীনে দায়িত্ব পালন করবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বহু বছর ধরে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট সেবাগুলো একটি একক প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার এই উদ্যোগ বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে একাধিক সংস্থার সঙ্গে পৃথকভাবে যোগাযোগ করার জটিলতার কথা তুলে ধরে আসছিলেন। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে সেই জটিলতা অনেকাংশে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বাস্তবে এই সংস্কারের সুফল কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করছে নতুন কর্তৃপক্ষের সাংগঠনিক কাঠামো কত দ্রুত ও সুসংহতভাবে গড়ে ওঠে, তার ওপর।

