বোরো ধানের গুরুত্বপূর্ণ সময় চললেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডিজেল সংগ্রহে সমস্যার অভিযোগ উঠেছে। মাঠপর্যায়ের অনেক কৃষক বলছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে ফসল উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
নড়াইলের এক কৃষক জানান, তিনি সকাল থেকে একাধিক পাম্প ঘুরেও ডিজেল পাননি। তার জমিতে জরুরি ভিত্তিতে সেচ প্রয়োজন, কিন্তু জ্বালানি না থাকায় কাজ শুরু করতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতি শুধু একটি এলাকার নয়—উত্তরাঞ্চল, হাওর এলাকা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জায়গা থেকেই একই ধরনের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশে বোরো ধান চাষ সম্পূর্ণভাবে সেচনির্ভর। সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত নিয়মিত পানি দিতে হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে লাখ লাখ গভীর ও অগভীর নলকূপ এবং লো-লিফট পাম্প ব্যবহার হচ্ছে, যার বড় অংশই ডিজেলচালিত। চলতি মৌসুমে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর একটি বড় অংশে সেচের জন্য ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকায় বিকল্প ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে জ্বালানির ঘাটতি নেই এবং সেচ কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে অনেক কৃষক অভিযোগ করছেন, পাম্পে পর্যাপ্ত ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না, আবার কোথাও সীমিত পরিমাণে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। কিছু এলাকায় ড্রাম বা জারিকেনে ডিজেল বিক্রি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে কৃষকদের লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, তবুও প্রয়োজন মেটানো যাচ্ছে না।
বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ এখন বিভিন্ন দেশ থেকে ডিজেল আমদানি করছে, তবুও বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বোরো উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দেশের মোট চাল উৎপাদনের বড় অংশ আসে বোরো ধান থেকে। ফলে উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে এবং বাজারে চালের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডিজেল সংকটের কারণে শুধু ধান নয়, গম কাটার কাজও বিলম্বিত হচ্ছে। কিছু এলাকায় মেশিন চালাতে না পারায় পাকা গম মাঠেই পড়ে আছে। একইভাবে আম বাগানে কীটনাশক ছিটানোর কাজেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলছেন: কৃষকদের জন্য আলাদা ডিজেল বরাদ্দ নিশ্চিত করা, মাঠ পর্যায়ে সরবরাহব্যবস্থার নজরদারি বাড়ানো, ভর্তুকি বাড়ানো এবং সরাসরি কৃষকের কাছে জ্বালানি পৌঁছানো, বিদ্যুৎচালিত সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ।
সরকার জানিয়েছে, সেচ কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকদের মূল দাবি—সময়ে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে ডিজেল সরবরাহ। কারণ, এই সময়ের সামান্য দেরিও পুরো মৌসুমের উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

