বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সরাসরি প্রবেশ আরও সহজ করতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের রপ্তানিকারকেরা এখন আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্ল্যাটফর্মে নিজেদের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির সুযোগ পাবেন। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর পথ আরও উন্মুক্ত হলো।
সোমবার জারি করা এক সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সংক্রান্ত নতুন নির্দেশনা দিয়েছে। এর মাধ্যমে ডিজিটাল বাণিজ্যের বিকাশ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক ই-কমার্স বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় দেশের রপ্তানিকারকেরা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত অনলাইন মার্কেটপ্ল্যাটফর্মে পণ্য তালিকাভুক্ত করতে পারবেন। এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তাঁরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভোক্তাদের কাছে সরাসরি পণ্য বিক্রির সুযোগ পাবেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রপ্তানি ব্যবস্থায় বিদেশি পরিবেশক বা আমদানিকারকের ওপর নির্ভর করতে হলেও এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উৎপাদক ও ক্রেতার মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন সহজ হবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, হস্তশিল্প, পাটপণ্য, গৃহসজ্জাসামগ্রী এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের জন্য এ সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে ছোট উদ্যোক্তারা এতদিন নানা প্রশাসনিক ও বিপণন-সংক্রান্ত বাধার মুখে পড়তেন।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, রপ্তানিকারকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনলাইন মার্কেটপ্ল্যাটফর্মের বৈধ অংশগ্রহণ বা মার্চেন্ট চুক্তি থাকতে হবে। এ চুক্তিতে অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি, লেনদেন নিষ্পত্তি এবং সম্ভাব্য বিরোধ সমাধানের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে এসব বিষয় যাচাই করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন সুবিধা মূলত স্বল্পমূল্যের রপ্তানি চালানের জন্য প্রযোজ্য হবে। ‘কস্ট অ্যান্ড ফ্রেট’ বা সিএফআর ভিত্তিতে প্রতিটি রপ্তানি লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। এর ফলে ছোট আকারের উদ্যোক্তারা তুলনামূলক সহজ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পারবেন।
রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করতে কিছু নথিগত সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। বিদেশি ক্রেতাদের নামে সরাসরি পরিবহন ও শিপিং নথি ইস্যু করা যাবে। এছাড়া প্রতি চালানের মূল্য ১ হাজার ডলার পর্যন্ত হলে প্রচলিত ইএক্সপি ফর্ম পূরণের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। তবে এ ক্ষেত্রে রপ্তানি আয় অবশ্যই অগ্রিম গ্রহণ করতে হবে এবং তা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল অথবা অনুমোদিত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে আনতে হবে।
১ হাজার ডলারের বেশি মূল্যের চালানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান রপ্তানি প্রক্রিয়া ও ইএক্সপি ফর্ম ব্যবহারের নিয়ম বহাল থাকবে। অর্থাৎ নতুন সুবিধা দেওয়া হলেও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, পণ্য রপ্তানির পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল বা অনুমোদিত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে রপ্তানি আয় দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অর্থপাচার ও অনিয়মের ঝুঁকিও কমবে।
সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, অনলাইন মার্কেটপ্ল্যাটফর্মকে দেওয়া কমিশন, সেবা ফি ও অন্যান্য ব্যয় বিদ্যমান নীতিমালার সীমার মধ্যেই থাকতে হবে। ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অপচয়ের সুযোগও সীমিত থাকবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী ই-কমার্সভিত্তিক সীমান্তপারের বাণিজ্য দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। উন্নয়নশীল অনেক দেশ ইতোমধ্যে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের রপ্তানি কার্যক্রমে যুক্ত করেছে। বাংলাদেশের নতুন এই সিদ্ধান্তও সেই বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তাঁদের মতে, এ উদ্যোগের ফলে শুধু বড় রপ্তানিকারক নয়, গ্রামীণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের পণ্য তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে দেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, বৈশ্বিক অনলাইন মার্কেটপ্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি পণ্যের উপস্থিতি বাড়লে দেশের ব্র্যান্ড পরিচিতিও শক্তিশালী হবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি রপ্তানি খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে এবং নতুন বাজার সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

