রাজধানী ঢাকার হারিয়ে যাওয়া খালগুলো পুনরুদ্ধারে বিশাল ব্যয়ের প্রাক্কলন দিয়েছে পরিকল্পনাবিদরা। ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী, শহরের বিদ্যমান ৬৫টি খাল পুনরুজ্জীবিত করতে মোট ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
একসময় ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা খালগুলো ছিল শহরের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল ও দূষণের কারণে অধিকাংশ খাল এখন সংকুচিত, ভরাট বা কার্যত অদৃশ্য হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় খালের জায়গায় গড়ে উঠেছে স্থাপনা, আবার কোথাও সেগুলো নর্দমায় পরিণত হয়েছে।
ড্যাপ সংশ্লিষ্টদের মতে, খাল পুনরুদ্ধার মানে শুধু খনন বা পরিষ্কার করা নয়। পুরো জলপথ ব্যবস্থাকে (ব্লু নেটওয়ার্ক) কার্যকর করতে হবে। ঢাকার ভেতরে প্রায় ৫৭৪ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল-নদীর এই নেটওয়ার্ক সচল করাই মূল লক্ষ্য। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনটি খাল—কল্যাণপুর, রায়েরবাজার ও রামচন্দ্রপুর—নিয়ে একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছে। প্রতিটি খাল পুনরুদ্ধারে গড়ে ১,০০০ থেকে ১,৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় ধরা হয়েছে। এর বড় অংশই যাবে ভূমি অধিগ্রহণ ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাল পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দখলমুক্ত করা। অনেক জায়গায় খালের প্রস্থ এতটাই কমে গেছে যে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই। রায়েরবাজার খালের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, শুধু জমি অধিগ্রহণেই প্রায় ৯৬৭ কোটি টাকার প্রয়োজন। এছাড়া খনন, পাড় উন্নয়ন, ওয়াকওয়ে, সবুজায়নসহ বিভিন্ন কাজে মিলিয়ে মোট ব্যয় প্রায় ১,১৪৮ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী খালের দুই পাশে হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে), সবুজ এলাকা ও বিনোদন সুবিধা তৈরির কথাও বলা হয়েছে। এতে শহরে উন্মুক্ত জায়গার অভাব কিছুটা কমবে। তবে জায়গা সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে খাল সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা এড়াতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জরুরি।
ঢাকায় মোট খালের সংখ্যা নিয়েও ভিন্নমত রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে পার্থক্য দেখা যায়। কোথাও ৬৫টি, কোথাও ৫৪টি, আবার ড্যাপে বৃহত্তর ঢাকায় ২১৯টি খালের উল্লেখ আছে। একই খাল বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন নামে পরিচিত হওয়ায় এ বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খালগুলো পুনরুদ্ধার করা গেলে জলাবদ্ধতা কমবে, শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং জীববৈচিত্র্য ফিরে আসবে। বর্তমানে খাল ও জলাশয় কমে যাওয়ায় ঢাকায় ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব বেড়েছে, পানির সংকটও তীব্র হয়েছে।নগর পরিকল্পনাবিদদের একটি অংশ মনে করেন, খাল দখলের ইতিহাস প্রকাশ করা জরুরি। কারা এসব খাল দখল করেছে এবং তারা কীভাবে লাভবান হয়েছে—এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র তৈরি করলে পুনরুদ্ধারের অর্থের একটি অংশ দখলদারদের কাছ থেকেই আদায় করা সম্ভব হতে পারে।
খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে দখলমুক্ত করা, সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকার এ বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে ঢাকার পরিবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সামগ্রিক জীবনমানের বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে।

