বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানিতে প্রতি মাসে প্রায় ৭৬০ থেকে ৮৩০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
লায়ন সিটি অ্যাডভাইজরি রিসার্চের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি এলএনজির মূল্যও ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২২.৫১ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের তুলনায় প্রায় ১২৫ শতাংশ বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে একদিকে বৈশ্বিক চাপ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার মুখে ফেলেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বর্তমানে প্রায় ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে প্রায় ৬৩ শতাংশই অব্যবহৃত থাকছে।
এই অদক্ষতার কারণে সরকারকে প্রতি বছর প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ও গ্রাহক পর্যায়ের দামের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেখানে ১৮ থেকে ২২ টাকা খরচ হচ্ছে, সেখানে ভর্তুকির পরিমাণ মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ধীরগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৪টি কূপ খননের লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে হয়েছে মাত্র ৮টি। ফলে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, এক মাসে এলএনজি আমদানিতে যে ৬৫০ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়, সেই অর্থ দিয়ে দেশে ১৫-২০টি গ্যাস কূপ খনন করা সম্ভব। এসব কূপ থেকে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যেত, যা আমদানি নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করত। এদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দর প্রায় ৯ টাকার কাছাকাছি, যা ফার্নেস অয়েল বা ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় অনেক কম। তবে নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে এই খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নীতিমালা সহজ করা গেলে ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌর প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব এবং এতে ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার বেসরকারি বিনিয়োগ আসতে পারে। শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও সিরামিক খাতে অপচয় হওয়া তাপ পুনর্ব্যবহার করে বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতের জন্য গবেষণায় ‘বাংলাদেশ এনার্জি ইন্ডিপেন্ডেন্স প্রোগ্রাম’ চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য ২০৪০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে উন্নীত করা। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কার না আনলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই রূপান্তর প্রক্রিয়া বিলম্বিত হলে প্রতি মাসেই অর্থনীতিকে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি বহন করতে হবে।

