বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। ১৫ মার্চ থেকে গতকাল (শুক্রবার) সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৫,৭৯২ শিশু, যার মধ্যে ১০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ৯ জনের শরীরে সরাসরি হামের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সম্প্রতি এই তথ্য প্রকাশ করেছে এবং জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯৪৭ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৮ মার্চ প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৫৬টি জেলা হামের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার, বরগুনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর জেলা উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন ও বরিশাল সিটি করপোরেশনও হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ডাক্তারদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে। এখানে ৩১৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং ২,৩৯৪ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১,১৯২ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ১৯৯ জন, বরিশালে ৭৬ জন, এবং খুলনায় তুলনামূলকভাবে আক্রান্তের সংখ্যা কম, কিন্তু এখানে ৮৯ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
ময়মনসিংহ বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৪। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন ১৮৬ শিশু এবং ৪৯ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পূর্বে প্রকাশিত তথ্যে কিছু ভুল তথ্য সংশোধন করা হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর জেলা থেকে পাঠানো ভুল তথ্যের কারণে পাঁচজন মৃত্যুর ঘটনা জাতীয় হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে, রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক নতুন মৃত্যুর ঘটনা যুক্ত হয়েছে।
উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সরকারের জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে দুই সপ্তাহব্যাপী এই কার্যক্রম চলবে এবং এতে ২০ থেকে ২১টি উপজেলা চিহ্নিত করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সব সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বিশেষ করে হাম এবং নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের সংক্রমণে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সেখানে ২৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া, গোপালগঞ্জে ১০ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন জানান, আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। আরও দ্রুত টিকা দিতে হবে এবং জনবল সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
সংক্রমণের প্রতিরোধে সরকারের কার্যক্রম এবং জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির মাধ্যমে সচেতনতা ও চিকিৎসা কার্যক্রমে জোর দেওয়া প্রয়োজন, যা করোনা পরবর্তী সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠছে।

