পুরোনো বছরের ক্লান্তি, গ্লানি আর না-পাওয়ার হিসাবকে পেছনে ফেলে নতুন আশার আলো নিয়ে হাজির হয়েছে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। আজ ১৪ এপ্রিল ২০২৬, পহেলা বৈশাখ। ভোরের প্রথম সূর্যের আলো ফুটতেই যেন নতুন করে জেগে উঠেছে পুরো দেশ। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ, আনন্দ আর একসঙ্গে নতুন শুরুর প্রতিজ্ঞা।
বাঙালির জীবনে এই দিনটি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; এটি এক আবেগ, এক ঐতিহ্য, এক মিলনের দিন। ধর্ম, বর্ণ, পেশা—সব ভেদাভেদ ভুলে মানুষ আজ এক কাতারে দাঁড়ায়, একসঙ্গে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। এ যেন হাজার বছরের সংস্কৃতি আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। আগের মতো হালখাতার সেই জমজমাট আয়োজন এখন আর তেমন দেখা যায় না। তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগেও বৈশাখের আবেগ কিন্তু একটুও কমেনি। বরং নতুন নতুন আয়োজন, রঙিন উৎসব আর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এই দিনটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বার্তায় বলেছেন, বাংলা নববর্ষ আমাদের গৌরবময় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক, যা আমাদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী এই দিনটিকে বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করে লোকজ ঐতিহ্য ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
রাজধানী ঢাকায় বরাবরের মতোই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। চারুকলা অনুষদের আয়োজনে মঙ্গল শোভাযাত্রা যেন বৈশাখের প্রাণ। রঙিন কাগজে তৈরি বিশাল সব মোটিফ—মোরগ, পায়রা, বেহালা, হাতি ও ঘোড়া—এই শোভাযাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ঢাকঢোল আর বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে এগিয়ে চলা এই আয়োজন শুধু আনন্দের নয়, বরং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ এবং কল্যাণময় আগামীর প্রত্যাশা।
রমনার বটমূলে ভোর থেকেই সংগীতের মূর্ছনায় নতুন বছরকে বরণ করেছে ছায়ানট। ‘শান্তি, মানবতা ও সম্প্রীতি’—এই বার্তা নিয়ে তাদের পরিবেশনা যেন সবার মনে নতুন আশার সুর জাগিয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন দিনভর গান, কবিতা ও নৃত্যের মাধ্যমে উৎসবকে আরও বর্ণিল করে তুলছে।
শুধু শহরেই নয়, গ্রামবাংলাতেও বইছে বৈশাখের হাওয়া। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসেছে বৈশাখী মেলা। কোথাও চলছে লাঠিখেলা, কোথাও বলিখেলা, আবার কোথাও হা-ডু-ডু—সব মিলিয়ে গ্রামীণ ঐতিহ্য যেন আবার নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলিখেলাও আগের মতোই দর্শকদের আকর্ষণ করছে।
এদিকে, এই বিশাল আয়োজনকে ঘিরে নিরাপত্তার দিকেও রাখা হয়েছে বিশেষ নজর। রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে, যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে উৎসব উপভোগ করতে পারে।

