জামিন পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসের বিনিময়ে এক কোটি টাকা দাবি করার অভিযোগকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুরু হওয়া আলোচিত তদন্ত তিন মাস পেরিয়েও শেষ হয়নি। অভিযোগ প্রকাশের পর দ্রুত তথ্য অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হলেও এখন পর্যন্ত তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে তদন্তের গতি ও কার্যকারিতা নিয়ে।
গত ১০ মার্চ প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় আটক সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের কাছে জামিন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক কোটি টাকা চেয়েছিলেন তৎকালীন প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার। প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয় এবং একই দিন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় পাঁচ সদস্যের একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে।
তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন প্রসিকিউটর মো. আবদুস সোবহান তরফদার, মার্জিনা রায়হান, মোহাম্মদ জহিরুল আমিন এবং সিনিয়র আইন গবেষণা কর্মকর্তা মো. ছিফাত উল্লাহ। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয় এই কমিটিকে।
তবে তদন্ত শুরুর প্রায় তিন মাস পরও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। কেন এত সময় লাগছে—এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, বিলম্বের পেছনে ইচ্ছাকৃত কোনো কারণ নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রশাসনিক ও বাস্তব পরিস্থিতির কারণে তদন্তের কাজ প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, কমিটির কয়েকজন সদস্য বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। কেউ কেউ পবিত্র হজ পালন করতে সৌদি আরবে গেছেন। তাঁদের ফেরার পর তদন্তের বাকি কাজ ও প্রতিবেদন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, নির্ধারিত সময়সীমার তুলনায় তদন্তে বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত এপ্রিলেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। সে সময় চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছিলেন, সাবেক চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গেও কথা বলা হবে, কারণ অভিযোগ ওঠার সময় তিনি প্রসিকিউশন টিমের প্রধান দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু এপ্রিল পেরিয়ে মে এবং পরে জুন মাস চলে এলেও তদন্তের ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
সাম্প্রতিক বক্তব্যে চিফ প্রসিকিউটর জানান, সাবেক চিফ প্রসিকিউটরের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও ব্যাখ্যা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদ হবে না। সৌজন্য বজায় রেখেই তাঁর সঙ্গে আলোচনা করা হবে, প্রয়োজনে সরাসরি সাক্ষাৎ বা টেলিফোনে কথা বলা হবে।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, টাকা চাওয়ার বিষয়ে অভিযুক্ত প্রসিকিউটর ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন বলে পূর্বে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন চিফ প্রসিকিউটর। ফলে তদন্তের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। আইন বিশ্লেষকদের মতে, এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি শুধু একজন ব্যক্তির আচরণের প্রশ্ন নয়; বরং পুরো বিচার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও জড়িত।
তদন্ত কমিটি গঠনের সময় জানানো হয়েছিল, শুধু নির্দিষ্ট অডিও বা কথোপকথনের সত্যতা যাচাই নয়, প্রসিকিউশন টিমের কোনো সদস্য কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্য কেউ অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবভিত্তিক প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল।
অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর অভিযুক্ত প্রসিকিউটরকে সংশ্লিষ্ট মামলা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে অন্য কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে তিনি প্রসিকিউটর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনালের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ও নৈতিক মানদণ্ড নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দায়িত্ব পাওয়া কয়েকজন প্রসিকিউটরকে ঘিরে পরবর্তীকালে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসে। নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর সেসব অভিযোগ পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে বর্তমান তদন্ত শুধু একটি ব্যক্তিগত অভিযোগের অনুসন্ধান নয়, বরং প্রসিকিউশন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরীক্ষাও হয়ে উঠেছে।
আইনজ্ঞদের মতে, উচ্চপ্রোফাইল ও সংবেদনশীল মামলার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে জনমনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বিচারপ্রার্থীরা তখন প্রশ্ন তুলতে পারেন, অভিযোগের সত্যতা উদ্ঘাটনে কর্তৃপক্ষ কতটা আন্তরিক। তাই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা যত বাড়বে, ততই জবাবদিহি নিয়ে বিতর্কও তীব্র হতে পারে।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট মহলের নজর এখন ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনের দিকে। তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, অভিযোগ কতটা সত্য প্রমাণিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়—সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে এই আলোচিত ঘটনার পরবর্তী অধ্যায়।

