ভোর হওয়ার আগের নিস্তব্ধ সময়, চারপাশে যখন গভীর ঘুমের আবহ, ঠিক তখনই কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। একটি শ্রমিকবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের খাদে পড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে স্বাভাবিক একটি যাত্রা পরিণত হয় মৃত্যুর মিছিলে।
সোমবার, ১৩ এপ্রিল দিবাগত রাত প্রায় পৌনে তিনটার দিকে উপজেলার হাসানপুর এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, দিনাজপুর থেকে নোয়াখালীগামী একটি চালবোঝাই ট্রাকে করে ধান কাটার শ্রমিকরা যাচ্ছিলেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় কোনো এক পর্যায়ে চালক ট্রাকটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। এরপরই ট্রাকটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায় এবং ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনার ধাক্কা এতটাই তীব্র ছিল যে ঘটনাস্থলেই সাতজন শ্রমিক প্রাণ হারান। নিহতরা হলেন আবজাল হোসেন (৩৫), সোহরাব হোসেন (৪০), আবু সালেক (৪২), সুমন মিয়া (২১), বিষু মিয়া (৩৪), আবু হোসেন (২৯) এবং আবদুর রশিদ (৫৮)। তারা সবাই দিনাজপুর জেলার বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে বাড়ি ছেড়ে অন্য জেলায় কাজের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন তারা, কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে উঠলো তাদের শেষ পথ।
এই দুর্ঘটনায় আরও পাঁচজন গুরুতর আহত হন। তারা হলেন আমির আলী, তরিকুল ইসলাম, জালাল হোসেন, মো. আমিনুল ইসলাম এবং জাহাঙ্গীর আলম। প্রথমে তাদের দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। তবে অবস্থার অবনতি হলে রাতেই তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, তাদের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন এবং তারা এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন।
দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল বাহার মজুমদার জানান, নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে থানায় রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে, দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক নয়ন দে আহতদের অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এই দুর্ঘটনা আবারও আমাদের সামনে বাংলাদেশের মহাসড়ক নিরাপত্তার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। প্রায়ই দেখা যায়, শ্রমিক বা পণ্যবাহী যানবাহনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হয়, চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম থাকে না, এবং অনেক ক্ষেত্রে যানবাহনের প্রযুক্তিগত ত্রুটিও থেকে যায়। রাতের দীর্ঘ যাত্রা, ক্লান্ত চালক এবং অপর্যাপ্ত নজরদারি—সব মিলিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
দাউদকান্দির এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি সাতটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের গল্প। যারা জীবিকার তাগিদে ঘর ছেড়েছিলেন, তাদের অনেকেই আর ফিরে যেতে পারবেন না। যারা বেঁচে আছেন, তারা লড়ছেন জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি এক অনিশ্চিত অবস্থায়।
এমন ঘটনা আমাদের শুধু শোকাহতই করে না, বরং প্রশ্ন তোলে—কবে আমাদের সড়কগুলো সত্যিই নিরাপদ হবে? যতদিন এই প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তর না মিলবে, ততদিন হয়তো এমন ট্র্যাজেডি আমাদের তাড়া করে ফিরবে বারবার।

