ছর ঘুরে আবারও এসেছে পহেলা বৈশাখ—বাংলা নববর্ষের সেই প্রতীক্ষিত দিন, যা বাঙালির প্রাণের উৎসব হিসেবে পরিচিত। চৈত্রের শেষ দিন পেরিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে রাজধানী ঢাকা এখন রঙিন আয়োজনে ভরপুর। গ্রামবাংলার চিরচেনা বৈশাখী মেলার পূর্ণ স্বাদ শহরে না মিললেও, গত কয়েক বছরে নগরজীবনেও এই উৎসব এক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে আজ বসেছে মেলা, আয়োজন করা হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকজ পরিবেশনা আর বিনোদনের নানা ব্যবস্থা। পরিবার, বন্ধু বা প্রিয়জনদের নিয়ে দিনটি উদযাপন করতে চাইলে ঢাকার বেশ কিছু জায়গা হয়ে উঠতে পারে আপনার গন্তব্য।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বিসিক ও বাংলা একাডেমির যৌথ উদ্যোগে শুরু হয়েছে ‘বৈশাখী মেলা ১৪৩৩’। ১৪ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এই মেলা চলবে। এখানে গ্রামীণ ঐতিহ্যের ছোঁয়া পাওয়া যাবে নানা ধরনের পণ্যে—মাটির তৈরি জিনিস, নকশিকাঁথা, হস্তশিল্প এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের তৈরি নানা বৈচিত্র্যময় সামগ্রী। শহরের ভেতরেই যেন গ্রামবাংলার এক টুকরো আবহ তৈরি হয়েছে এই মেলায়।
অন্যদিকে বনানীর যাত্রাবিরতি আয়োজনস্থলে দুই দিনব্যাপী বৈশাখী উৎসব চলছে। এখানে বাউলগান, নাচ, পুতুলনাচ, বায়োস্কোপ প্রদর্শনীসহ রয়েছে লোকজ সংস্কৃতির নানা উপস্থাপনা। উৎসবের পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলছে সোনার বাংলা সার্কাস ব্যান্ডের অংশগ্রহণ। এই আয়োজনে প্রবেশমূল্য রাখা হয়েছে ৫০০ টাকা।
গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোডের আলোকি প্রাঙ্গণে ‘আর্কা বৈশাখ ১৪৩৩’ নামের একটি ভিন্নধর্মী আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আর্কা কালেকটিভের এই দুই দিনব্যাপী উৎসবে মেলা, খেলাধুলা, খাবারের আয়োজন এবং মঞ্চ পরিবেশনা—সবকিছুই একসঙ্গে সাজানো হয়েছে। বিভিন্ন ব্যান্ডের পারফরম্যান্সে দিনভর জমে থাকবে এই আয়োজন, যার প্রবেশমূল্য প্রতিদিন ৫০০ টাকা।
বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কেও ‘লাল বৈশাখী’ নামে একটি জমজমাট আয়োজন রয়েছে। এখানে নাগরদোলা, বায়োস্কোপ, ফটোবুথসহ নানা বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি কনসার্টে অংশ নিচ্ছেন জনপ্রিয় ব্যান্ড ও শিল্পীরা। এই উৎসবে প্রবেশমূল্য ৩০০ টাকা।
আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে চলছে এসএমই বৈশাখী মেলা, যা চলবে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত। ৩০০টিরও বেশি স্টলে দেশীয় পণ্য, পোশাক ও খাবারের সমাহার রয়েছে। প্রতিদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও থাকছে, যা দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে কাজ করছে। এখানে প্রবেশমূল্য রাখা হয়েছে ৩০ টাকা, যা তুলনামূলকভাবে সবার নাগালের মধ্যে।
ভাটারার শেফস টেবিল কোর্টসাইডে ‘উৎসবে বৈশাখ’ নামে আরেকটি আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১৪ এপ্রিল। এখানে আলপনা আঁকা, পাপেট শো, বাউলগান, নাগরদোলা ও নানা খেলাধুলার ব্যবস্থা রয়েছে। বিকেলের পর শুরু হবে কনসার্ট। সাধারণ প্রবেশমূল্য ২০০ টাকা হলেও কনসার্ট উপভোগ করতে চাইলে ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হবে।
এসব বড় আয়োজনের বাইরে রাজধানীর প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লাতেই ছোট-বড় বৈশাখী উৎসব দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে বসছে ক্ষুদ্র মেলা, পরিবেশিত হচ্ছে লোকজ গান, আর খাবারের স্টলগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন উৎসবপ্রেমীরা।
সব মিলিয়ে, এবারের পহেলা বৈশাখে ঢাকা যেন এক বিশাল উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও মানুষ খুঁজে নিচ্ছে আনন্দ, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সংযোগ। এই দিনটি কেবল নতুন বছরের সূচনা নয়, বরং বাঙালির শেকড়ের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হওয়ার এক অনন্য সুযোগ।

