বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে চলমান অস্থিরতার প্রভাবে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দাম সমন্বয়ের পথে এগোচ্ছে সরকার, যার অংশ হিসেবে গঠন করা হয়েছে একটি উচ্চ পর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি।
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ৯ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে এই কমিটি গঠন করা হয়। এতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী সদস্য হিসেবে রয়েছেন। পাশাপাশি অর্থ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবরাও কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এই কমিটি বিদ্যুতের বর্তমান মূল্য কাঠামো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের সুপারিশ মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করবে।
সরকারের এই উদ্যোগকে ঘিরে এরই মধ্যে আইনি কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কারণ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণের মূল দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে গণশুনানির মাধ্যমে ট্যারিফ নির্ধারণ করে আসছিল, যা খাতটির স্বচ্ছতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতো।
তবে ২০২২ সালে আইনে পরিবর্তন আনা হলে সরকার সরাসরি দাম নির্ধারণের ক্ষমতা পায়। এরপর গণশুনানি ছাড়াই গেজেটের মাধ্যমে মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আবারও গণশুনানি প্রক্রিয়া চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং বিইআরসিকে সক্রিয় করার চেষ্টা শুরু হয়।
এই অবস্থায় নতুন করে মন্ত্রিসভা কমিটির মাধ্যমে দাম সমন্বয়ের উদ্যোগকে আইনি কাঠামোর সঙ্গে দ্বৈততা তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, আইন অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বিইআরসির ভূমিকা স্পষ্ট থাকলেও বাস্তবে নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা আবারও সরকারের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, বিদ্যুৎ খাতে অস্বচ্ছ ব্যয় ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তার মতে, এই ঘাটতিকে ভিত্তি করে দাম সমন্বয় করলে তা ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। আগে প্রকৃত ব্যয় ও অপ্রয়োজনীয় খরচ চিহ্নিত করা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, আইন অনুযায়ী কমিশনের মাধ্যমে দাম নির্ধারণের কথা থাকলেও একটি পূর্ণাঙ্গ বিধিমালার অভাব রয়েছে। তার ভাষায়, বিধিমালার খসড়া বহুবার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও তা এখনো অনুমোদন হয়নি, ফলে বাস্তব প্রয়োগে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিমের মতে, দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা এখন আমদানিনির্ভরতার কারণে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে এলএনজি ও তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে ভর্তুকির ওপর চাপ বেড়ে গিয়ে অর্থনীতিতে নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, শুধু মার্চ ও এপ্রিলে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনায় অতিরিক্ত প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলে দৈনিক বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। চলতি বাজেটে ভর্তুকির জন্য নির্ধারিত অর্থ ইতোমধ্যে চাপের মুখে পড়েছে, এবং আগামী মাসগুলোতে আরও বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, উচ্চ ভর্তুকি এবং বাজেট ঘাটতি—এই তিনটি চাপে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মূল্য সমন্বয় এখন সরকারের জন্য প্রায় অনিবার্য একটি সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এর প্রভাব সরাসরি পড়বে সাধারণ ভোক্তার জীবনযাত্রা ও মূল্যস্ফীতির ওপর—এ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

