বিএনপি সরকারের মেয়াদ এখন মাত্র দুই মাস। এই অল্প সময়েই প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে তদবির-বাণিজ্য বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা। দলীয় নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অনৈতিক সুপারিশ বা তদবিরে তারা কোনো ধরনের সাড়া দিচ্ছেন না বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যকে সামনে রেখে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পাশাপাশি এমপিদেরও কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাদের ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য বা বক্তব্য না দেওয়ার জন্যও স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। প্রভাবশালী এমপিদের কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে, যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা যায়।
এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সরকার তদবির, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সরকারের শুরুটা সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে এগোচ্ছে। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়েছে। তবে কয়েকজন মন্ত্রীর ‘বেফাঁস’ মন্তব্যের কারণে মাঝে মাঝে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলেও তারা মনে করেন।
বিএনপির একাধিক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সরকারপ্রধান তারেক রহমানের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করছেন। তিনি নিজেও নির্ধারিত সময়ে সচিবালয়ে উপস্থিত থাকছেন এবং নিয়মিত দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তার দেখাদেখি অন্য মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরাও সময়মতো অফিসে আসছেন। পাশাপাশি কোন কাজ করা যাবে আর কোন কাজ করা যাবে না—এ বিষয়েও তারা স্পষ্ট ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সরকারের বিশেষ টিমের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন বলেও জানা গেছে। এতে প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা বাড়ছে এবং সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত খালি তদবির। যেসব বিষয় প্রয়োজন আছে, সেগুলো করতে হবে। কিন্তু এগুলোকেই (তদবির) যদি প্রধান গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে তো সমস্যা হবে।’
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, সরকার গঠনের প্রথম দিনেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের স্পষ্টভাবে অনৈতিক কোনো কাজ বা তদবিরে জড়িত না হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি না করতে যাতে কাউকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিতে বাধ্য হতে হয়। তার এই কঠোর বার্তার পর থেকে সবাই আরও সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জানা গেছে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি বিশেষ টিম তাদের কার্যক্রম মনিটর করছে। ছয় মাস পর তাদের কাজের অগ্রগতি মূল্যায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। যেসব মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে গাফিলতি বা অনৈতিক অভিযোগ উঠবে, সেসব ক্ষেত্রে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের রদবদল কিংবা মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকতে পারে। পাশাপাশি নতুন মুখ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনে তদবিরের চাপ বাড়ছে বলে জানা যায়। তৃণমূল থেকে শুরু করে রাজধানীর নেতা-কর্মীরা নানা ধরনের আবেদন ও অনুরোধ নিয়ে সচিবালয়ে ভিড় করছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও মন্ত্রণালয় ও প্রভাবশালী নেতাদের দপ্তরে নিয়মিত যাতায়াত করছেন। এসব আবেদনের মধ্যে রয়েছে উন্নয়নকাজ, কৃষি ও বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়, ঠিকাদারি কাজ, সারের ডিলার নিয়োগ, নির্মাণ প্রকল্প, পদোন্নতি, বদলি, নতুন নিয়োগ এবং চাকরির সুপারিশসহ নানা দাবি।
গত দুই মাসে এ ধরনের তদবিরের চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বিরক্ত ও বিব্রত অবস্থায় পড়েছেন বলে জানা গেছে। তবে তারা আইনসম্মত বিষয়গুলো বিবেচনার আশ্বাস দিচ্ছেন এবং অনৈতিক সুবিধা না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছেন। অনেক সময় তারা তদবিরকারীদের প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনার কথাও জানিয়ে দিচ্ছেন।
একাধিক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রতিদিনই বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ তাদের কাছে নানা অনুরোধ ও প্রস্তাব নিয়ে আসছেন। এতে অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। কেউ কেউ আবার অতীত রাজনৈতিক আন্দোলনে নিজেদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে সহযোগিতা চাইছেন। তবে কোনো তদবিরের মাধ্যমে যেন বিশেষ সুবিধা না দেওয়া হয়, সে বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছেন। প্রকাশ্যে কঠোর কিছু না বললেও ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়ে গেছে। প্রথমবার দায়িত্ব নিয়েছি, তাই কাজের ধরন বুঝে নিচ্ছি। জনগণের জন্যই রাজনীতি করি, তাই ভবিষ্যতেও ন্যায়সংগত থাকার চেষ্টা করব। কারণ পাঁচ বছর পর আবার জনগণের কাছেই ফিরে যেতে হবে।’
সরকার গঠনের পর থেকেই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে কথা বলার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা জনসমক্ষে বিক্ষিপ্তভাবে প্রকাশ না করার বিষয়েও নির্দেশনা রয়েছে। এর পরও গত দুই মাসে কয়েকজন মন্ত্রীর ‘বেফাঁস’ মন্তব্য নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা ও ট্রলও হয়েছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও এসব বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে বলে জানা যায়। এমন পরিস্থিতিতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কম কথা বলে কাজে মনোযোগী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৮০ দিনের কাজের অগ্রগতি মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী সচিবালয়ে তদবিরকারীর বিষয়ে কিছু বিধিনিষেধ থাকলেও রাজনৈতিক সরকারের সময়ে তা অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হয়েছে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসেও সচিবালয়ে তদবিরকারীদের উপস্থিতি ব্যাপক ছিল বলে জানা যায়। সেই সময় কয়েকজন উপদেষ্টাও বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।

