এম এস রহমান,পাবনা প্রতিনিধি-
পাবনার ফরিদপুর উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকের পাশে অবস্থিত পৌর শিশু পার্কের জায়গা একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে দোকান করতে বরাদ্দ দেওয়া ও সেখানকার দুটি গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় বইছে।
যদিও এ ঘটনার সাথে স্থানীয় দুজন বিএনপি নেতার চাঁদা দাবির বিষয়টি আলোচনায় উঠলেও অনুসন্ধানে তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। সাধারণ মানুষের সমালোচনার পর জায়গা বরাদ্দ স্থগিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি ঘটনাটি সরেজমিনে পরিদর্শণ করে ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকের পাশে চলতি বছরের জানুয়ারী মাসে অল্প পরিসরে শিশু পার্কটি গড়ে তোলা হয়েছে। যেখানে কয়েকটি গাছ রয়েছে, যা রোদ থেকে ছায়া দেয়। যেখানে শিশুদের বসার জন্য তিনটি ইট সিমেন্টের বেঞ্চ বানানো হয়েছে। প্রবেশমুখে রয়েছে উদ্বোধন ফলক। যেখানে লেখা রয়েছে উদ্বোধন করেছেন জেলা প্রশাসক। এ নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেন পৌর সদরের বাসিন্দারা। তারা এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান।
গত মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকালে স্থানীয়রা দেখতে পান পার্কের এক পাশে থাকা দুটি গাছ রাতের আঁধারে কেটে ফেলা হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি ও লেখা পোস্ট হওয়ার পর সমালোচনার ঝড় ওঠে। পার্কের মধ্যে ছায়াদানকারী দুটি গাছ কেটে ফেলা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে পৌর বাসিন্দারা। এর মধ্যে পরদিন সকালে গাছ কেটে ফেলা জায়গায় দোকান ঘর তোলার কাজ শুরু করেন কয়েকজন মিস্ত্রি। এ সময় শিশু পার্কের জায়গায় ঘর তোলা দেখে বাধা দেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, এটি কোনো হাট বা পেরিফেরির জায়গা নয়; বরং উপজেলা পরিষদের প্রবেশমুখে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দৃষ্টিনন্দন শিশু পার্ক। যা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উদ্বোধন করা হয়েছিল। সেখানে দোকান ঘরের জন্য জায়গা বরাদ্দ দেওয়া সমীচীন হয়নি। পৌরসভার মধ্যে অনেক খাস জায়গা আছে। সেখান থেকে দেওয়া যেত।
পরবর্তীতে জানা যায়, বনওয়ারীনগর ইউনিয়নের গোপালনগর গ্রামের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধি ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি জহুরুল ইসলাম ওরফে বিজলী খাতুনকে ওই জায়গাটি বরাদ্দ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। তিনি সেখানে গাছ কেটে দোকান ঘর নির্মাণ করছিলেন। স্থানীয়দের বাধার পর নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর দুএকটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করা হয়, ওই জায়গায় দোকান নির্মাণ করতে তৃতীয় লিঙ্গের জহুরুল ইসলাম ওরফে বিজলী খাতুনের কাছে চাঁদা দাবি করেছিলেন উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব আমিন উদ্দিন সাবেরী, বনওয়ারীনগর বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক টিপু, উপজেলা শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহ সম্পাদক রাজিবুল হক প্রান্ত সহ স্থানীয়রা। চাঁদা না দেওয়ায় তারা দোকান ঘর নির্মাণে বাধা দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সবার সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিজলী খাতুনের কাছে কেউ কোনো চাঁদা চায়নি। তার লিখিত অভিযোগেও চাঁদা দাবির কথা উল্লেখ নেই। এমনকি খোদ তৃতীয় লিঙ্গের বিজলী খাতুনও বলেছেন, তার কাছে কেউ চাঁদা দাবি করেনি। যাদের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির কথা বলা হয়েছে সে ঘটনার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব আমিন উদ্দিন সাবেরী বলেন, আরো তো জায়গা আছে, শিশু পার্কের জায়গায় কেন বরাদ্দ দিতে হবে। আমরা স্থানীয়দের নিয়ে সেটার প্রতিবাদ করেছি। চাঁদা দাবির অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন মিথ্যা। মূলত অনিয়মের প্রতিবাদ করার কারণে এই মিথ্যা অপবাদ ছড়ানো হয়েছে। এটা আমাদের স্থানীয় নেতৃবৃন্দেরও একটা ষড়যন্ত্র। শুধু এটাই না। এসিল্যান্ড অফিসের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী বিপুল অংকের টাকা নিয়ে জমি বরাদ্দ পাইয়ে দিচ্ছেন।
উপজেলা শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা বলেন, এসি ল্যান্ড অফিসের নাজির ও সার্ভেয়ারের যোগসাজসে টাকার বিনিময়ে পৌরসভার বাজারর মধ্যে অনেক জায়গা বরাদ্দ পাইয়ে দিয়েছে কয়েকজন নেতাকে। সেসব জায়গায় এখন ছাদ দিয়ে ভবনও নির্মাণ করা হচ্ছে। যা আইনসিদ্ধ নয়। এসবের প্রতিবাদ করার কারণে আমাদের নামে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে। শিশু পার্কের জায়গা বরাদ্দ বাতিল করতে হবে। না হলে আমরা আরো কঠোর কর্মসূচী ঘোষণা করবো।
তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি জহুরুল ইসলাম ওরফে বিজলী খাতুন বলেন, আমাকে উপজেলা প্রশাসন বরাদ্দ দিয়েছিল। সেখানে দুটো জরাজীর্ণ ও মরা গাছ কেটে দোকান ঘর করছিলাম। কিন্তু শুরুর সময় সাবেরী, টিপু সহ কয়েকজন বাধা দেয়। আমি সেটার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। তবে আমি মিথ্যা বলবো না, আমার কাছ কেউ চাঁদা চায়নি। আমার অভিযোগেও চাঁদার কথা উল্লেখ নেই। কেউ ষড়যন্ত্র করে বলে থাকতে পারে।
ফরিদপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের সার্ভেয়ার মনোয়ার হোসেন ও নাজির জমির উদ্দিন বলেন, বিজলীকে জমি বরাদ্দের বিষয়টি উপজেলা সমন্বয় মিটিংয়ে পাশ করে রেজুলেশন করে বরাদ্দ দিয়েছিলেন এসি ল্যান্ড। বাধা দেওয়ার পর সেটি বন্ধ আছে। কাটা কাছ আমাদের অফিসের সামনে রাখা আছে। নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। আর জায়গা বরাদ্দ স্থগিত রাখা হয়েছে।
তারা আরো বলেন, আর আমরা টাকা নিয়ে জায়গা বরাদ্দ দেই এই অভিযোগ সম্পূর্ন বানোয়াট। কারণ জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার মালিক আমরা না। আমরা শুধু হুকুম পালনের কর্মচারী। আসলে তাদের নিজেদের দ্বন্দ্বে আমাদের বলির পাঁঠা বানাতে চাচ্ছে। বিষয়টি দু:খজনক।
এ বিষয়ে কথা বলতে ফরিদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) উম্মে ইমামা বানিনের অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তার সাড়া মেলেনি।

