দেশের ধান উৎপাদনের সবচেয়ে বড় অংশ আসে বোরো মৌসুমে। সাধারণত এই সময় গ্রামাঞ্চলে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যায়। কিন্তু এবার সেই আনন্দের জায়গায় দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। ফসল ঘরে তোলার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে কৃষকরা পড়েছেন জ্বালানি, কৃষিযন্ত্র, শ্রম এবং পরিবহন—এই চার দিক থেকে তীব্র সংকটে। ফলে সময়মতো ধান কাটা ও সংগ্রহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের কৃষক, যন্ত্রচালক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আধুনিক কৃষি এখন পুরোপুরি জ্বালানিনির্ভর। জমিতে সেচ দেওয়া থেকে শুরু করে ধান কাটা, মাড়াই, পরিবহন—সব ধাপেই ডিজেলের প্রয়োজন। কিন্তু সরবরাহে ঘাটতি থাকায় অনেক জায়গায় কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এতে শুধু উৎপাদন খরচই বাড়ছে না, ফসল ঘরে তোলার সময়ও পিছিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে ধান কাটার পুরো প্রক্রিয়ায় পাঁচটি ধাপে জ্বালানি লাগে—ধান কাটা, মাড়াই, জমি থেকে সংগ্রহ, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণ। শ্রমিক সংকট ও মজুরি বৃদ্ধির কারণে কৃষকরা যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। কম্বাইন হারভেস্টার, থ্রেশার, পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টরসহ প্রায় সব যন্ত্রই ডিজেলচালিত। কিন্তু প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় অনেক যন্ত্র মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
সরকারি হিসাবে দেশে ২১ লাখের বেশি ডিজেলচালিত কৃষিযন্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে সেচ পাম্প, ট্রাক্টর, হারভেস্টার ও মাড়াই যন্ত্র উল্লেখযোগ্য। সেচ মৌসুমে কৃষিতে মোট ডিজেলের চাহিদা প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭ হাজার টন ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম থাকায় কৃষি খাত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ডিজেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। অনেক এলাকায় ১০৩ টাকার ডিজেল ১৩০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। ছোট ও মাঝারি কৃষকের জন্য এটি বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি না পাওয়ার কারণে সেচ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কৃষক অভিযোগ করেছেন, সরকারি ব্যবস্থায় স্লিপ পেলেও পাম্পে গিয়ে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে জমিতে পানি দেওয়া এবং অন্যান্য কৃষিকাজে বিঘ্ন ঘটছে। একই সঙ্গে পরিবহন খাতেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। ধান কাটার পর দ্রুত গুদাম বা বাজারে নিতে না পারলে ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।
হাওরাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও জটিল। এসব এলাকায় ধান কাটার সময় খুব সীমিত। হঠাৎ বৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় আগাম বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক জমিতে পানি জমে থাকায় হারভেস্টার ব্যবহার করা যাচ্ছে না, ফলে শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
যন্ত্র সংকটও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাওর অঞ্চলে দ্রুত ধান কাটতে প্রয়োজন কয়েক হাজার কম্বাইন হারভেস্টার, কিন্তু সচল রয়েছে তার অর্ধেকেরও কম। অনেক যন্ত্র মেরামতের অভাবে অচল পড়ে আছে। খুচরা যন্ত্রাংশের সংকট ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নতুন করে যন্ত্র সচল করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
গত কয়েক বছরে কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি না থাকায় নতুন যন্ত্র সরবরাহও বাড়েনি। ফলে যন্ত্রের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সেই অনুযায়ী অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে মোট আবাদযোগ্য জমির একটি ছোট অংশেই আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সময়মতো ধান ঘরে তোলা না গেলে শুধু কৃষক নয়, পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। বোরো ধান দেশের খাদ্য সরবরাহের প্রধান ভিত্তি। এই মৌসুমে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
সরকারি পর্যায়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত এবং অচল যন্ত্র দ্রুত সচল করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব প্রতিফলন এখনও সীমিত। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কৃষিযন্ত্র মালিকদের তালিকা ধরে পরিচয়ভিত্তিক জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষিতে জ্বালানির ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে জরুরি। প্রয়োজনে আমদানি বাড়ানো বা ভর্তুকি দিয়ে হলেও এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে। কারণ কৃষিতে সামান্য বিঘ্নও দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।

