মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদী। তিনি বলেছেন, বিষয়টি কোনো দ্বিপাক্ষিক বিরোধ বা কূটনৈতিক ব্যর্থতার ফল নয়; বরং নির্ধারিত শর্ত ও প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার কারণেই কিছু জাহাজ চলাচলে বাধার মুখে পড়েছে।
সম্প্রতি সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট শর্তে হরমুজ প্রণালী সীমিত আকারে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খুলে দেওয়া হয়। শুরুতে প্রতিদিন নির্দিষ্টসংখ্যক জাহাজ চলাচলের অনুমতি থাকলেও বাস্তবে খুব কম জাহাজ এই পথ ব্যবহার করতে পেরেছে। পরবর্তীতে পরিস্থিতির আংশিক উন্নতি হলে প্রণালী আবার চালু করা হয়, কিন্তু তখনও কড়াকড়ি বিধিনিষেধ বহাল ছিল।
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রণালী ব্যবহার করতে হলে কয়েকটি শর্ত মানা বাধ্যতামূলক। প্রথমত, কেবল বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি পাবে; সামরিক বা যুদ্ধসংশ্লিষ্ট কোনো পণ্য পরিবহন করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি জাহাজকে আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। তৃতীয়ত, নির্ধারিত নৌপথ অনুসরণ করেই চলাচল করতে হবে।
রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ এই পূর্বানুমতির প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করেছিল। ফলে নিয়ম অনুযায়ী সেটিকে আটকে দেওয়া হয়। একই ধরনের ঘটনা অন্য দেশের জাহাজের ক্ষেত্রেও ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে গণমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনে এই প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলো না থাকায় জনমনে ভিন্ন ধারণা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিক তালিকা অনুসরণ করা হচ্ছে। যেসব দেশ আগে আবেদন করেছে, তাদের জাহাজ আগে ছাড়পত্র পাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রাথমিক তালিকায় কিছু ত্রুটি থাকায় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হয়েছে, যা পরে সংশোধন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রতি ইরানের অবস্থান সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক ইতিবাচক এবং সহযোগিতামূলক। আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে—বিশেষ করে প্রবাসী কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাজারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইরান তা সহানুভূতির সঙ্গে দেখে থাকে।
এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। এখানে যেকোনো অনিশ্চয়তা সরাসরি জ্বালানি সরবরাহ, আমদানি-রপ্তানি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এ ধরনের পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমন্বয়, সঠিক তথ্যপ্রবাহ এবং নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো মূলত আন্তর্জাতিক উত্তেজনা, নিরাপত্তা শর্ত এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জটিলতার ফল। বিষয়টি রাজনৈতিক বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

