প্রতি বছর ঈদুল আজহাকে ঘিরে রাজধানীর কোরবানির হাটগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পশু আসে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খামারিরা ঢাকার বাজারকে লক্ষ্য করে গরু-ছাগল নিয়ে আসেন। এতে একদিকে নগরবাসীর জন্য পশু কেনা সহজ হয়, অন্যদিকে পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট খাতে কিছুটা কর্মসংস্থানও তৈরি হয়।
তবে চলতি বছর সেই স্বাভাবিক চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খামারি ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একদিকে গো-খাদ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে। ফলে অনেক খামারি ঢাকায় গরু আনার পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। এর সরাসরি প্রভাব কোরবানির বাজারে পশুর সরবরাহ ও দামে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মেহেরপুরের খামারি মনিরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে গরু পালন আর আগের মতো লাভজনক নেই। তার ভাষায়, ৮০ হাজার টাকায় একটি গরু কিনে লালন-পালনে আরও প্রায় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। ৮ থেকে ৯ মাস পর সেই গরু প্রায় দুই লাখ টাকায় বিক্রি করা গেলেও শ্রম ও অন্যান্য খরচ ধরলে লাভ খুবই সীমিত থাকে। তবুও খামারিরা এই কাজ চালিয়ে যান, কারণ এতে একসঙ্গে বড় অঙ্কের টাকা পাওয়া যায়, যা পারিবারিক বড় খরচ মেটাতে কাজে লাগে।
তিনি বলেন, “গো-খাদ্যের দাম আকাশছোঁয়া। আর পরিবহন খরচ গত বছরের তুলনায় এখনই প্রায় পাঁচ হাজার টাকা বেড়েছে। কোরবানির সময় তা আরও বাড়তে পারে। এসব কারণে আদৌ গরু ঢাকায় নিয়ে যেতে পারবো কি না, তা নিয়ে এখন সংশয়ে আছি।”
কুষ্টিয়া-ঢাকা রুটে ট্রাক চালানো আল-আমিনও পরিবহন খরচ বাড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, গত বছর কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় গরু পরিবহনে খরচ ছিল প্রায় ২৫ হাজার টাকা, যা এখন বেড়ে ৩০ হাজার টাকারও বেশি হয়েছে। তার মতে, জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে কোরবানির আগমুহূর্তে এই খরচ ৩৫ হাজার টাকার নিচে পাওয়া কঠিন হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অনেক সময় ট্রাককে জ্বালানির জন্য এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত সময়ের খরচ কে বহন করবে—এ প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।
ছোট পিকআপে ঢাকায় যেতে এখন ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাগছে বলে জানান আল-আমিন। বড় ট্রাকের ক্ষেত্রে খরচ আরও বেশি। জ্বালানির দাম ও সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই ভাড়া আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
খামারিদের মতে, শুধু পরিবহন নয়, গরু পালনের প্রতিটি ধাপে খরচ বেড়েছে। কুষ্টিয়ার আমলা এলাকার খামারি মজিবর রহমান বলেন, ভুসি, ভাঙানো গম ও ভুট্টাসহ সব ধরনের খাদ্যের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি গরুর স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে নিয়মিত ভিটামিন, পাউডার, লিকুইড ও ইনজেকশন ব্যবহার করতে হয়, যার খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, গরমের কারণে গরুকে নিয়মিত ফ্যানের নিচে রাখতে হয়। তবে লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক সময় হাতপাখার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে গরুর পরিচর্যায় বাড়তি শ্রম ও খরচ যুক্ত হচ্ছে।
মজিবর রহমান আরও জানান, “সব মিলিয়ে এত খরচের পর তেমন কোনো লাভ থাকে না। তারপরও খামারিরা আশা করেন, ঢাকায় গরু বিক্রি করে একসঙ্গে বড় অঙ্কের টাকা পাবেন। কিন্তু এখন ট্রাকের ভাড়া বাড়তে শুরু করায় এ বছর ঢাকায় যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।”
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গো-খাদ্যের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। প্রতি কেজি গমের খোসা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, খুদ ৫৫ টাকা, ভাঙানো ভুট্টা ৪৫ টাকা এবং ভাঙানো গম ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঘাস, কাঠাল পাতা, বিছালি ও ধানের গুড়ার দামও বেড়েছে।
খামারিদের হিসাব অনুযায়ী, গরমের সময় একটি গরুর পেছনে প্রতি মাসে ভিটামিন বাবদ এক থেকে দেড় হাজার টাকা খরচ হয়। রোগ দেখা দিলে চিকিৎসা ব্যয় তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকায় পৌঁছে যায়। অ্যান্টিবায়োটিক ও জিংকসহ অন্যান্য ওষুধের খরচও এর সঙ্গে যুক্ত হয়।
চুয়াডাঙ্গার গো-খাদ্য ব্যবসায়ী আকুল হোসেন জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে খাদ্য পরিবহনের গাড়ি কমে গেছে, ফলে দাম বেড়েছে। তারা বেশি দামে কিনে সীমিত লাভে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বলেন, অধিকাংশ খামারি বাকিতে খাদ্য নেন এবং কোরবানির পর গরু বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু এবার যদি খামারিরা ঢাকায় গরু না নিতে পারেন, তাহলে বকেয়া পরিশোধে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এতে ব্যবসায়ীরাও আর্থিক চাপে পড়বেন।
তবে কিছু খামারি নিজস্ব উদ্যোগে ঘাস চাষ করে খরচ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করছেন। মেহেরপুরের গাংনীর খামারি আশরাফ আলী জানান, নিজস্ব জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ করে খরচ কমালেও অন্যান্য ব্যয় কমানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, “গরু মোটা-তাজা করতে প্রতিদিন গোসল করানোর জন্য শ্রমিক রাখতে হয়। কোরবানির আগে দিনে দুইবার গোসল করাতে হয়, সপ্তাহে একদিন শ্যাম্পু ব্যবহার করতে হয়। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে এখন অতিরিক্ত শ্রমিকের প্রয়োজন হচ্ছে। সব মিলিয়ে এ বছর ঢাকায় গরু নেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।”
এদিকে রাজধানীতে আসন্ন ঈদুল আজহাকে ঘিরে ২৪টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মোট ২৪টি স্থানে হাট ইজারার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর পাশাপাশি গাবতলী ও সারুলিয়ার স্থায়ী হাটেও কোরবানির পশু বিক্রি হবে। ঈদের দিনসহ মোট পাঁচ দিন রাজধানীতে পশুর হাট চলবে বলে পরিকল্পনা রয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, খামার থেকে শুরু করে পরিবহন, খাদ্য ব্যবসা এবং খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাই চাপের মুখে। এই চাপ অব্যাহত থাকলে কোরবানির বাজারে পশুর সরবরাহ কমে যেতে পারে, যা দামের ওপরও প্রভাব ফেলবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।

