সকালের আলো ধীরে ধীরে তীব্র হয়ে উঠছে ঠাকুরগাঁওয়ের আকাশে। সেই রোদের মধ্যেই এক অদ্ভুত দৃশ্য—চাকার ওপর বসানো একটি যন্ত্র খেতের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরই সেটি গর্জে ওঠে। মাটির গভীর থেকে টেনে আনে পানি। সেই পানি আল বেয়ে ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। কৃষিজমি যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়।
এই ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচযন্ত্রের পেছনে আছেন সোলেমান আলী। তাঁর বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোলানী গ্রামে। জ্বালানি তেলের দাম ও লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি যখন কৃষকের বড় সমস্যা, তখন তিনি সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করেছেন একটি স্বল্প খরচের সমাধান। সহজে এক খেত থেকে আরেক খেতে নেওয়া যায় এমন একটি সৌরচালিত সেচযন্ত্র।
সোলেমানের পথচলা শুরুটা সহজ ছিল না। অভাবের কারণে প্রথম শ্রেণির পরই তাঁর পড়াশোনা থেমে যায়। পরে জীবিকার তাগিদে তিনি সাইকেল মেরামতের কাজ শুরু করেন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে যুক্ত হন ইনস্ট্যান্ট পাওয়ার সাপ্লাই (আইপিএস) তৈরির কাজে। এই অভিজ্ঞতাই তাকে প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী করে তোলে। ২০১৩ সাল থেকে তিনি সৌর সেচব্যবস্থা নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি বলেন, “সঠিকভাবে সৌরশক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশের বিদ্যুৎ–সংকট অনেকটাই কমে যাবে।”
বছরের পর বছর বিভিন্ন সৌর প্যানেল, কন্ট্রোলার ও যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। একসময় নিজের মতো করে একটি সৌর সেচযন্ত্রের মডেল তৈরি করেন। পরে এতে গিয়ার বক্স যুক্ত করে পানির গতি বাড়ান। সূর্যের অবস্থান অনুযায়ী প্যানেল ঘোরানোর ব্যবস্থা করেন। পুরো কাঠামোতে চাকা বসিয়ে এটিকে ভ্রাম্যমাণ করে তোলেন। ফলে এক জমি থেকে আরেক জমিতে সহজেই নিয়ে যাওয়া যায় এই যন্ত্র। কৃষকের জমিতে আগে থেকেই সেচ পাম্পের বোরিং করা থাকে। সেখানে এই সৌর সেচযন্ত্র স্থাপন করলেই পানি তোলা সম্ভব হয়।
সোলেমানের তৈরি যন্ত্রে রয়েছে ১০টি সৌরকোষ, প্রতিটির ক্ষমতা ২৫০ ওয়াট। মোট ক্ষমতা ২ হাজার ৫০০ ওয়াট। সূর্যের আলো পেলেই এটি বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে, যা দিয়ে তিন হর্সপাওয়ারের পানির পাম্প চালানো হয়। প্রতি মিনিটে অন্তত ৭০০ লিটার পানি তোলা যায়। এক দিনে প্রায় ১০ একর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব।
খরচের দিক থেকেও এই প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। এক ওয়াট সৌরকোষের দাম ২৮ টাকা। সেই হিসাবে ২ হাজার ৫০০ ওয়াটের প্যানেলের দাম পড়ে প্রায় ৭০ হাজার টাকা। পাম্প ও কাঠামো তৈরিতে আরও ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়। সব মিলিয়ে একটি ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচযন্ত্র তৈরি করতে লাগে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা।
এই যন্ত্র ভাড়া দিয়ে বছরে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা আয় করেন সোলেমান। পাশাপাশি কেউ কিনতে চাইলে তিনি বিক্রিও করেন। প্রতিটি যন্ত্রের দাম মানভেদে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ ১০ হাজার টাকা। তিনি শুধু যন্ত্র তৈরি করেন না, কারিগরি সহায়তাও দেন। এখন পর্যন্ত তিনি শতাধিক সৌর সেচযন্ত্র তৈরি ও বিক্রি করেছেন। এর মধ্যে ছয়টি নিজে ব্যবহার করছেন এবং ২০টি ভাড়ায় চালু রয়েছে।
কৃষকদের অভিজ্ঞতাও ইতিবাচক। সাধারণ সেচযন্ত্রে যেখানে প্রতি বিঘায় সাত থেকে আট হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে সৌর সেচযন্ত্রে খরচ নেমে এসেছে প্রায় তিন হাজার টাকায়। সদর উপজেলার আরাজি ঝাড়গাঁও গ্রামের কৃষক আবু বকর জানান, লোডশেডিং বা জ্বালানির ঝামেলা নেই। সময়মতো সেচ দেওয়া যাচ্ছে, ফলে ফলনও ভালো হচ্ছে এবং খরচও কমেছে।
বালিয়াডাঙ্গীর বারোঢালির কৃষক আরিফুল হক নিজেই একটি সৌর সেচযন্ত্র কিনে ব্যবহার করছেন। নিজের জমিতে সেচ দেওয়ার পর অন্যদের কাছেও ভাড়া দেন তিনি। প্রতি বিঘায় সেচের জন্য নেন তিন হাজার টাকা। তাঁর মতে, “সাশ্রয়ের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ হওয়ায় এটি সহজেই এক জমি থেকে আরেক জমিতে নেওয়া যায়—এটাই এর বড় সুবিধা।”
সরেজমিনে সোলেমানের বাড়িতে দেখা যায়, তিনি লিচুগাছের নিচে বসে মুরগির খামারের নেট তৈরি করছেন। পাশেই চলছে ঝালাইয়ের কাজ। তিনি জানান, তাঁর বাড়ির প্রায় সব কাজই এখন সৌরশক্তির ওপর নির্ভরশীল। তিনি দেখিয়ে বলেন, “এটাও সৌরশক্তিতে চলছে।” এরপর জানান, মুরগির খামার, হ্যাচারি, ফ্যান, পানি পাম্প, এমনকি ভারী কিছু যন্ত্রও এখন সৌরশক্তিতে চালানো হয়। বাড়িতে ২০টির বেশি লাইট, আটটি ফ্যান, ফ্রিজ, এসি, বৈদ্যুতিক চুলা, টেলিভিশন—সবই চলে এই শক্তিতে। আগে যেখানে মাসে বিদ্যুৎ বিল আসত ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা, এখন তা নেমে এসেছে এক হাজার টাকার নিচে।
সোলেমানের এই উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় বলে মনে করছেন কৃষি কর্মকর্তারা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, সোলেমানের উদ্ভাবিত এই সৌর সেচ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা গেলে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে। পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেচসুবিধাও বাড়বে।

