জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পরও সারা দেশে তেল সংকট ও দীর্ঘ লাইনে ভোগান্তি না কমায় আজ থেকে সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনের সামনে কয়েকশ মিটার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে চালকদের, যা জনদুর্ভোগকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, ২০ এপ্রিল থেকে প্রতিদিন নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি তেল বাজারে ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিদিন ১৩ হাজার ৪৮ টন ডিজেল, ১ হাজার ৪২২ টন অকটেন এবং ১ হাজার ৫১১ টন পেট্রল সরবরাহ করা হবে। এতে ডিজেল ও পেট্রলের সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ এবং অকটেনের সরবরাহ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এই বর্ধিত হারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। দাম বৃদ্ধির পরও পাম্পগুলোতে তেলের সংকট এবং দীর্ঘ লাইন অব্যাহত রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চালকরা পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছেন না।
এর আগে অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা, পেট্রলের দাম ১৯ টাকা এবং ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ানো হয়। এই মূল্যবৃদ্ধির পর সাধারণ মানুষ আশা করেছিলেন, সরবরাহ বাড়বে এবং সংকট কমবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে প্রকৃত কোনো জ্বালানি সংকট নেই। বরং আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা, মজুতদারি এবং কালোবাজারির কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। তবে এই ব্যাখ্যার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল খুঁজে পাচ্ছেন না অনেক ভোক্তা ও সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, মোটরসাইকেল ও গাড়িচালকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। কেউ কেউ আগের রাত থেকে লাইনে থাকলেও পরদিন গিয়ে জ্বালানি পাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ট্যাংক পূর্ণ করতে না দিয়ে সীমিত পরিমাণ তেল দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পাম্পগুলোতে তদারকি জোরদার, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং মনিটরিং টিম গঠনের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেনি।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে। একদিকে বলা হচ্ছে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। তাদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাই এ সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে।
পাম্প মালিকদের একটি অংশের দাবি, দাম বাড়ানো হলেও ডিপো থেকে সরবরাহ যথেষ্ট বাড়েনি। অনেক ক্ষেত্রে ধারণক্ষমতার তুলনায় কম তেল দেওয়া হচ্ছে, ফলে চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। তাদের মতে, টানা কয়েকদিন পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হতে পারত। অন্যদিকে, সরকার বলছে—নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, তবে আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত কেনাকাটা বন্ধ না হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না।
জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। বিরোধী পক্ষের বক্তব্য, যদি প্রকৃতপক্ষে কোনো সংকট না থাকে, তাহলে সারা দেশে দীর্ঘ লাইনের ব্যাখ্যা কী—এই প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির চাপের কারণে সরকারকে মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে। তবে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাজারে জ্বালানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা।
রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোথাও অকটেন ও পেট্রলের তীব্র সংকট, কোথাও আবার সীমিত ডিজেল সরবরাহের কারণে পরিবহন খাত ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় অধিকাংশ পাম্পে জ্বালানি না থাকায় কয়েকটি সচল স্টেশনে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে, যা আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সার্বিকভাবে, মূল্যবৃদ্ধির পরও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় জনদুর্ভোগ কমেনি। এখন সরকার ঘোষিত অতিরিক্ত সরবরাহ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে।

