দেশে জ্বালানি তেলের সংকটের প্রভাব এখন বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ খাতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। সারাদেশে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় জনজীবন যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল সেবাও বড় ধরনের চাপে পড়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে কোনো কোনো এলাকায় দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল সরবরাহ না থাকায় অনেক এলাকায় জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ না থাকার পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থাও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার ওপর।
দেশের মোবাইল অপারেটররা এই পরিস্থিতিকে গুরুতর ও ক্রমবর্ধমান সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছে। মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব) জানিয়েছে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগসেবা বজায় রাখা সম্ভব নয়।
এই উদ্বেগ জানিয়ে গত শনিবার বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়েছে অ্যামটব। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী। সংগঠনটির মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে টেলিযোগাযোগসেবা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, দেশজুড়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়া ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় সভা প্রয়োজন। এতে বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি বিভাগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং মোবাইল অপারেটরদের যুক্ত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির চিত্রও উদ্বেগজনক। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বেলা ৩টায় সারা দেশে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল। এর আগে বৃহস্পতিবার এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯২৩ মেগাওয়াট।
অ্যামটবের হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রধান তিন মোবাইল অপারেটরের বেস ট্রান্সসিভার স্টেশন (বিটিএস) সচল রাখতে প্রতিদিন ৫২ হাজার ৪২৫ লিটার ডিজেল এবং ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার অকটেন প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের জন্য ২৮ হাজার ৭৯ লিটার ডিজেল ও ৯ হাজার ২৫৪ লিটার অকটেন, রবি আজিয়াটার জন্য ১৩ হাজার ১৪০ লিটার ডিজেল ও ৫ হাজার ৬১০ লিটার অকটেন এবং বাংলালিংকের জন্য ১১ হাজার ২০৬ লিটার ডিজেল ও ৪ হাজার ৯৯৫ লিটার অকটেন প্রয়োজন হচ্ছে।
লোডশেডিংয়ের কারণে মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল রাখতে এখন জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, জ্বালানি সংকটে মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিচালনা বড় চ্যালেঞ্জে পড়েছে। দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। তিনি জানান, জ্বালানি সরবরাহে অনিয়ম ও পরিবহন জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি টেলিকম অবকাঠামোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং জ্বালানি পরিবহন সহজ করার আহ্বান জানান।
অ্যামটবের তথ্য অনুযায়ী, শুধু একটি ডেটা সেন্টার চালু রাখতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। ফলে একটি ডেটা সেন্টার সচল রাখতে দিনে প্রায় ৪ হাজার লিটার ডিজেল দরকার হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় জ্বালানি স্টেশনগুলো এই চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।
মোট হিসেবে ডেটা সেন্টার ও সুইচিং সেন্টার চালু রাখতে প্রতিদিন অপারেটরদের ২৭ হাজার ১৯৬ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হচ্ছে। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের ১১ হাজার ১৮৪ লিটার, রবির ৯ হাজার ৭৩২ লিটার এবং বাংলালিংকের ৮ হাজার ২০০ লিটার ডিজেল লাগে।
বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকট নেটওয়ার্ক পরিচালনায় বড় চাপ তৈরি করেছে। তার মতে, টেলিযোগাযোগকে জরুরি পরিষেবা হিসেবে বিবেচনা করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দেশে মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৮ কোটি ৫৮ লাখ ৪০ হাজার মানুষ মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশের নিজস্ব মোবাইল রয়েছে এবং প্রায় ১১ কোটি মানুষ মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করে।
অ্যামটবের চিঠিতে আরও সতর্ক করা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে নেটওয়ার্ক অপারেটরদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এতে দেশের বড় অংশে টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা জরুরি সেবা, আর্থিক লেনদেন, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে।
চিঠিতে বলা হয়, দীর্ঘ সময় বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ না পাওয়া এবং জ্বালানি ঘাটতির কারণে অপারেটররা চরম পরিচালন সংকটে পড়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝড় ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এ অবস্থায় অ্যামটব কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সেন্টার ও বেস স্টেশনগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা, সংকটকালে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ, ডিপো থেকে সরাসরি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি পরিবহনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা।
অ্যামটব মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, ডেটা সেন্টার বন্ধ হলে পুরো নেটওয়ার্ক কার্যত অচল হয়ে যেতে পারে। এতে কল, ইন্টারনেট, এসএমএসসহ সব সেবা ব্যাহত হবে। ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং অনলাইন লেনদেনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, ডেটা সেন্টারই নেটওয়ার্কের মূল কেন্দ্র, এটি বন্ধ হলে পুরো ব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়ে।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী জানান, বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে অবহিত করা হয়েছে এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয়ই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, এবং এ লক্ষ্যে কাজ চলছে।

