দেশের বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ দিন দিন বাড়ছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই এই খাতে বকেয়া উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের শুরুর দিকে মোট বকেয়ার পরিমাণ ৫২ হাজার কোটির বেশি ছাড়িয়েছে, যা দুই মাস আগের তুলনায় প্রায় ৫ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা বেশি।
সরকারি হিসাবে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া ছিল প্রায় ৪৬ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এই অঙ্ক দ্রুত বেড়ে যায়। তুলনামূলকভাবে আগের অন্তর্বর্তী সরকারের দীর্ঘ সময়েও যে পরিমাণ বকেয়া বেড়েছিল, তার চেয়ে বেশি বৃদ্ধি হয়েছে এই স্বল্প সময়ে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ এবং বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য এই সংকটের অন্যতম কারণ। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় ১২ টাকার কাছাকাছি হলেও পাইকারি বিক্রয়মূল্য ৬ টাকার কিছু বেশি। ফলে প্রতি ইউনিটেই কয়েক টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে নিয়মিত ভর্তুকি দিতে হয়, কিন্তু বাস্তবে সেই ভর্তুকি প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় দেনা জমে বাড়ছে।
বকেয়ার বড় অংশ বিভিন্ন খাতে জমা হয়েছে। গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিলও পরিশোধ হয়নি সম্পূর্ণভাবে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ ও জ্বালানি খরচ বাবদ বিশাল অঙ্কের পাওনা জমেছে। একইভাবে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র এবং সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও বকেয়ার চাপ উল্লেখযোগ্য।
শুধু বকেয়াই নয়, বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণও উদ্বেগজনক। বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট ব্যাংক ঋণ এক লাখ ৪৯ হাজার কোটির বেশি বলে জানা গেছে, যা সামগ্রিকভাবে খাতটির আর্থিক ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে এই সংকট মূলত কাঠামোগত। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বিক্রয়মূল্য সেই অনুযায়ী সমন্বয় করা হয়নি। ফলে ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। কিন্তু বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে সরকার প্রয়োজনীয় ভর্তুকি দিতে পারছে না। চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য ঘাটতি ৫০ হাজার কোটির বেশি হতে পারে, অথচ বরাদ্দ রয়েছে এর চেয়ে অনেক কম।
খাত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তারা মনে করছেন, বিদ্যুতের দাম ধীরে ধীরে সমন্বয় করা হলে ঘাটতি কিছুটা কমানো যেতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষতা বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতে দ্রুত বাড়তে থাকা দেনা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় চাপ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—উভয় ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

