দেশজুড়ে খুনসহ গুরুতর অপরাধের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। পারিবারিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা ও জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব—বিভিন্ন কারণে প্রতিনিয়ত প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। কোথাও আপনজনের হাতেই নিহত হচ্ছে স্বজন, আবার কোথাও গোষ্ঠীগত সংঘাতে ঝরছে প্রাণ।
সাম্প্রতিক এক দিনে পাঁচ জেলায় ১০ জন হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরেছে। পাহাড়ি এলাকা থেকে একাধিক মরদেহ উদ্ধার, একই পরিবারের চারজনকে হত্যা, কিংবা ভাইয়ের হাতে ভাই খুন—এ ধরনের ঘটনাগুলো সমাজে সহিংসতার বিস্তারকে স্পষ্ট করছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সারাদেশে ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে ৩১৭টি খুনের ঘটনা ঘটে। মাসিক গড় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮৪টি। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৭৫০টি, আর তার আগের বছরে ছিল ৭১০টি। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে খুনের সংখ্যা বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ ও চুরির মতো অপরাধের পরিসংখ্যান একটি দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সেই হিসেবে বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতাকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সহিংস ঘটনার পর বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি লুট হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যার একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র অপরাধে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন আলোচিত হত্যাকাণ্ড বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, আর্থিক বিরোধ, প্রেমঘটিত সংঘাত, কিংবা সন্ত্রাসী আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষের জেরে খুনের ঘটনা ঘটছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়েও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না সহিংসতা।
এদিকে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর শতাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
অন্যান্য অপরাধের চিত্রও পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। চলতি বছরে ডাকাতি, ছিনতাই ও চুরির ঘটনা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ঘটেছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে আগের বছরের তুলনায় সংখ্যা কমেছে, তবুও ভুক্তভোগীদের অনেকেই অভিযোগ না করায় প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অপহরণ ও ধর্ষণের ঘটনাও উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় এখনও বড় সংখ্যা দেখা যাচ্ছে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে সামান্য হ্রাস পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক অস্থিরতা, মাদক বিস্তার এবং আইনের প্রয়োগে দুর্বলতা—এসব কারণ মিলেই অপরাধ প্রবণতা বাড়াচ্ছে। তারা দ্রুত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন।সার্বিকভাবে, খুনসহ গুরুতর অপরাধের ঊর্ধ্বগতি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

