বাংলাদেশকে এখন বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি হিসেবে দেখা হয়। উন্নয়ন, অবকাঠামো, উৎপাদন, নগরায়ণ—সব দিকেই অগ্রগতির দৃশ্য আছে। কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে আরেকটি কঠিন সত্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—আয় ও সম্পদের বৈষম্য ভয়াবহভাবে বাড়ছে। অর্থনীতির পরিধি বাড়লেও সেই বৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
এই বৈষম্য কেবল ধনী ও গরিবের আয়ের দূরত্ব নয়। এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, নাগরিক মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় আস্থা এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের প্রশ্নও। সমাজের একদল মানুষ যখন দ্রুত সম্পদ সঞ্চয় করে, আর অন্যদিকে বিশাল জনগোষ্ঠী নিত্যজীবনের নিরাপত্তা নিয়েই অনিশ্চয়তায় থাকে, তখন উন্নয়ন আর সবার থাকে না—তা হয়ে ওঠে কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত সাফল্যের গল্প।
বৈষম্যের পেছনে কী কী কারণ কাজ করছে
আজকের ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের পেছনে বহুস্তরীয় কারণ আছে। তার মধ্যে রয়েছে উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের নীরব বা সক্রিয় সহায়তা, বাজারে একচেটিয়া শক্তির বিস্তার, সুশাসনের ঘাটতি, দুর্বল জবাবদিহি, অপশাসন এবং সর্বোপরি দুর্নীতি।
যখন কিছু শক্তিশালী গোষ্ঠী উন্নয়ন প্রকল্পের চুক্তি নিজেদের দখলে নেয়, তখন প্রতিযোগিতা কমে যায়। আবার ব্যবসা, সঙ্গীত, ক্রীড়া, চলচ্চিত্রসহ নানা ক্ষেত্রে এমন অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হয় যেখানে প্রায় সব লাভ গিয়ে জমা হয় অল্প কয়েকজনের হাতে। এই ধরনের পরিস্থিতি সমাজের নিচের স্তরের মানুষের জন্য আরও প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে।
একচেটিয়া আধিপত্যের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার বাজারে। তখন সাধারণ মানুষকে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান, যাতায়াতের মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে বেশি মূল্য গুনতে হয়। বাজারে যখন প্রতিযোগিতা কমে যায়, তখন কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দাম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়, আর নাগরিক হয়ে ওঠে অসহায় ভোক্তা।
নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারে একচেটিয়া প্রভাব কেন বিপজ্জনক
বাংলাদেশে বহুদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে যে চিনি, ভোজ্যতেলসহ জরুরি পণ্যের বাজারে অনেক উৎপাদক ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, ফলে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মূল্য নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাচ্ছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাজের অনুমতিপত্রের সেবামূল্য, বিমানভাড়া, এমনকি হজে মক্কা যাওয়ার ভাড়াও কিছু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা বলা হয়।
এখানে সমস্যাটি শুধু দাম বাড়া নয়। এর ফলে সাধারণ মানুষের আয় দিয়ে আগের মতো জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে যায়। যারা কম আয়ের মানুষ, তাদের ওপর এই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে। অর্থাৎ বাজারের একচেটিয়াকরণ সরাসরি বৈষম্য বাড়ায়।
ধনীদের সম্পদ বাড়লে কি গরিবও উপকার পায়
অনেকেই বলেন, অর্থনীতিতে ধনীদের সম্পদ বাড়লে তার কিছু সুফল একসময় নিচের স্তরের মানুষের কাছেও পৌঁছায়। কিন্তু বাস্তব চিত্র তেমন আশাবাদী নয়। বাংলাদেশসহ বহু দেশে দেখা গেছে, উপরের স্তরে সম্পদ জমা হলেও নিচের স্তরে তার প্রতিফলন খুব সীমিত। উল্টো স্থির মজুরি, দুর্বল জনসেবা, ভেঙে পড়া অবকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
অর্থাৎ কেবল ধন সঞ্চয় মানেই সবার উন্নতি—এই ধারণা বাস্তবের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। যে অর্থনৈতিক কাঠামোতে সম্পদ ক্রমাগত অল্প কয়েকজনের হাতে জমা হয়, সেখানে সামাজিক গতিশীলতা কমে যায়, সুযোগ সীমিত হয়, আর বৈষম্য হয়ে ওঠে আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী।
বাংলাদেশে লুকানো সম্পদের প্রশ্ন কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশে শুধু কোটিপতি নয়, শতকোটিপতি ও আরও বড় সম্পদশালীদের অস্তিত্ব নিয়ে বহু আলোচনা আছে। কিন্তু এই বিপুল সম্পদের বড় অংশ দেশের বাইরে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি ও বিনিয়োগে লুকানো আছে—এমন অভিযোগও জোরালো। ১১ জন বাংলাদেশির নাম পান্ডোরা পেপারসে উঠে আসা এই সন্দেহকে আরও জোরদার করেছে।
এই বাস্তবতা একটি বড় সংকটকে সামনে আনে। দেশে কার কাছে কত সম্পদ আছে, তার নির্ভুল হিসাব পাওয়া কঠিন। পুঁজি পাচার, কর ফাঁকি, সম্পদ গোপন রাখা এবং বিদেশে বিনিয়োগের অস্বচ্ছতা মিলিয়ে প্রকৃত সম্পদচিত্র অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়। ফলে জাতীয় অর্থনীতির শক্তি কতটা দেশে থাকছে এবং কতটা বাইরে চলে যাচ্ছে, সেটি পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় না।
দুবাইয়ে সম্পদ সরানোর প্রবণতা কী ইঙ্গিত দেয়
বাংলাদেশের ধনী গোষ্ঠীর একটি অংশ দেশের বাইরে সম্পদ সরিয়ে নিচ্ছে—এমন অভিযোগ নতুন নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের বড় উৎসগুলোর একটি। কিন্তু একই সঙ্গে দেশটির কিছু শহর বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজের নথির ভিত্তিতে ইউরোপীয় কর পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে, ৪৫৯ জন বাংলাদেশি দুবাইয়ে সম্পত্তি কিনেছেন, তথ্য গোপন করে। ২০২০ সাল পর্যন্ত নথি বলছে, তারা সেখানে ৯৭২টি সম্পত্তি কিনেছেন, যার মূল্য প্রায় ৩১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এটি প্রায় ৩৫ বিলিয়ন টাকা বা ৩৫০০ কোটি টাকার সমান। অভিযোগ হলো, এসব সম্পদের বিপরীতে তারা প্রাপ্য করও পরিশোধ করেননি।
এই তথ্যের গুরুত্ব এখানেই যে, এটি শুধু বিদেশে সম্পদ কেনার ঘটনা নয়; এটি দেশের অর্থনীতির ভেতর থেকে সম্পদ বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতারও ইঙ্গিত দেয়।
করব্যবস্থা দুর্বল হলে বৈষম্য কেন বাড়ে
যে সমাজে কার্যকর করব্যবস্থা নেই, সেখানে বৈষম্য কমানো খুব কঠিন। কারণ কর শুধু রাজস্ব আদায়ের উপায় নয়, এটি সম্পদের ন্যায়সংগত পুনর্বণ্টনের একটি মাধ্যমও। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগজনকভাবে কম। কোথাও এটি ৯ শতাংশ, আবার কোথাও ৭.৫ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে বলা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি সর্বনিম্ন এবং নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর গড়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম।
এর অর্থ হলো, রাষ্ট্র পর্যাপ্ত রাজস্ব তুলতে পারছে না। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, স্থানীয় সেবা, গণপরিবহন—এসব খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। ধনী ব্যক্তি ব্যক্তিগত খরচে ভালো সেবা কিনতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় সেবার দুর্বলতার কারণে আরও পিছিয়ে পড়ে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের সম্পদের ৪৫ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত করের আওতার বাইরে থাকে। এ তথ্য শুধু দুর্বল কর প্রশাসনের কথা বলে না, বরং রাষ্ট্রীয় ন্যায়বোধের সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরে।
দেশে কোটিপতি বাড়ছে দ্রুত
২০২৩ সালের জুন মাসের শেষে দেশের ব্যাংক খাতে ১ কোটি টাকার বেশি আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতার সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬৮৯। তুলনায় ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্যাংক খাতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ১৯,১৬৩। এই বৃদ্ধি স্পষ্ট করে যে দেশের এক অংশে সম্পদ দ্রুত সঞ্চিত হচ্ছে।
তবে এটিই পুরো ছবি নয়। কারণ এটি কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে হিসাবভুক্ত সংখ্যা। এর বাইরে আরও বহু সম্পদশালী ব্যক্তি আছেন, যাদের প্রকৃত সম্পদের নির্ভুল হিসাব নেই। ফলে বাস্তবে বৈষম্যের চিত্র নথিভুক্ত হিসাবের চেয়েও বড় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আগামী বছরগুলোতে উচ্চ সম্পদশালীর সংখ্যা আরও বাড়বে
নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ এক্স-এর ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পরবর্তী পাঁচ বছরে বিশ্বের উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ থাকবে নাইজেরিয়া ও মিসরের পরে তৃতীয় স্থানে। এই প্রতিষ্ঠানের হিসাবে, ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদধারীদের অতি উচ্চ সম্পদশালী হিসেবে ধরা হয়।
এই তালিকায় বাংলাদেশ ভিয়েতনাম, পোল্যান্ড, চীন, কেনিয়া, ভারত, ফিলিপাইন ও ইউক্রেনেরও আগে। অর্থাৎ দেশের উচ্চবিত্ত ও অতি উচ্চবিত্ত শ্রেণির সম্পদ সঞ্চয়ের গতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও স্পষ্ট হয়েছে।
কিন্তু এই প্রবণতার বিপরীতে নিচের স্তরের মানুষের আয় ও জীবনমান কীভাবে বদলাচ্ছে—সেই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ।
আয়ের বণ্টন কী বলছে
বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিচের ৪০ শতাংশ মানুষের আয় অংশ ২১ শতাংশ, আর সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে ২৭ শতাংশ আয়। এই ব্যবধান দেখায় যে জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ তুলনামূলক ছোট একটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
এই চিত্র কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্যের নয়, বরং সুযোগের বৈষম্যেরও প্রতিফলন। যখন নিচের স্তরের মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপদ কাজ ও সামাজিক সুরক্ষায় পিছিয়ে থাকে, আর ওপরের স্তরের মানুষ আরও সম্পদশালী হয়, তখন সমাজে ভারসাম্য নষ্ট হয়।
বিশ্বের ধনীরা বেশি কর দেওয়ার কথা বলছে
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য আছে। উন্নত বিশ্বের বহু কোটিপতি ও বৃহৎ সম্পদশালী ব্যক্তি নিজেরাই সম্পদের ওপর বেশি কর আরোপের দাবি তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, অত্যধিক সম্পদ জমে থাকলে তা সমাজের জন্য ইতিবাচক নয়; বরং জনসেবায় বিনিয়োগের মাধ্যমে সেই সম্পদের একটি অংশ সমাজে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।
২০২৪ সালের জানুয়ারির শুরুতে দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক বৈঠকে ওইসিডি দেশের ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বেশি সম্পদকর দেওয়ার পক্ষে মত দেন। ২৫০ জনেরও বেশি বৃহৎ সম্পদশালী ব্যক্তি ও কোটিপতি একটি খোলা চিঠিতে বিশ্বজুড়ে জনসেবা খাতে অর্থ জোগাতে সম্পদকর আরোপের আহ্বান জানান।
তাদের বক্তব্য ছিল, বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যদি দ্রুত বেড়ে চলা অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবিলায় ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। এই অতিরিক্ত কর তাদের জীবনযাত্রার মান নষ্ট করবে না, সন্তানদের সুযোগ কেড়ে নেবে না, দেশের প্রবৃদ্ধিও থামাবে না; বরং অকার্যকরভাবে জমে থাকা ব্যক্তিগত বিপুল সম্পদকে সবার ভবিষ্যতের বিনিয়োগে পরিণত করবে।
জরিপ কী দেখিয়েছে
দেশপ্রেমিক কোটিপতিদের পক্ষে পরিচালিত এক জরিপে জি-২০ দেশের ২৩শর বেশি উত্তরদাতা অংশ নেন, যাদের বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ ১০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি, নিজস্ব বাসভবন বাদ দিয়ে। এদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইউরোপীয় কর পর্যবেক্ষণ সংস্থা প্রস্তাবিত বৃহৎ সম্পদশালীদের ওপর ২ শতাংশ সম্পদকরের পক্ষে মত দেন।
৭৪ শতাংশ মনে করেন, জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট মোকাবিলা এবং জনসেবা উন্নত করতে সম্পদের ওপর বেশি কর প্রয়োজন। ৭২ শতাংশ মনে করেন, অতিরিক্ত সম্পদ রাজনৈতিক প্রভাব কেনার সুযোগ দেয়। ৫৪ শতাংশ মনে করেন, চরম সম্পদ গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। সংস্থাটির সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের বৃহৎ সম্পদশালীদের ওপর মাত্র ২ শতাংশ কর আরোপ করলেই বছরে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তোলা সম্ভব।
বাংলাদেশের সঙ্গে এই চিত্রের পার্থক্য কোথায়
বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধারণা হলো, ধনী ব্যক্তিরা ন্যায্য হারে কর দেন না। অনেকেই অবৈধভাবে আয় করেন, আবার সেই সম্পদ করের আওতার বাইরে রাখেন। কেউ কেউ দেশের ভেতরেও তা গোপন করেন, আবার কেউ বিদেশে সরিয়ে দেন। অভিযোগ আছে, এই অর্থের একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে চলে যায়।
ফলে একদিকে রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় রাজস্ব পায় না, অন্যদিকে সমাজে সম্পদের বৈষম্য আরও বেড়ে যায়। এর প্রভাব কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও বড় ধাক্কা তৈরি করে।
বৈষম্য কেন গণতন্ত্রের জন্যও হুমকি
যখন অল্প কয়েকজনের হাতে বিপুল সম্পদ জমা হয়, তখন তারা নীতিনির্ধারণ, বাজার, প্রভাব ও ক্ষমতার ওপরও অধিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি করতে পারে। সাধারণ মানুষ তখন মনে করে নিয়ম সবার জন্য সমান নয়। কেউ কর দেয়, কেউ দেয় না; কেউ বাজারদর মেনে চলে, কেউ বাজার নিয়ন্ত্রণ করে; কেউ আইনের সামনে দাঁড়ায়, কেউ প্রভাবের আড়ালে থেকে যায়।
এই অনুভূতি গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল করে। নাগরিক আস্থা কমে যায়, সামাজিক সংহতি ভাঙে, আর ন্যায়বিচারের ধারণা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বৈষম্যকে কেবল অর্থনীতির একটি সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি রাষ্ট্রীয় ন্যায় ও গণতান্ত্রিক স্থিতিরও প্রশ্ন।
উন্নয়নের সঙ্গে ন্যায্য বণ্টন না এলে সংকট বাড়বে
গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন করেছে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের পথে অগ্রগতিও স্পষ্ট। কিন্তু একই সময়ে এই প্রশ্নও জোরালো হয়েছে যে, এই উন্নয়ন কতটা ন্যায়ভিত্তিক। কারণ দেশের নিচের অর্ধেক মানুষ এখনও সাধারণ জীবিকা, কাজের নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও স্থিতিশীল আয় নিয়ে সংগ্রাম করছে।
অক্সফাম আগে জানিয়েছিল, বিশ্বে প্রথম খরবপতি দেখা যেতে পারে ২০৩৪ সালের মধ্যে। বিশ্ব যখন এই মাত্রার সম্পদসংকেন্দ্রণের দিকে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশের মতো দেশে বৈষম্যের প্রশ্ন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ এখানে করব্যবস্থা দুর্বল, বাজার নিয়ন্ত্রণ সীমিত, আর সামাজিক সুরক্ষাও পর্যাপ্ত নয়।
এখন কী করা দরকার
বাংলাদেশে আয়বৈষম্য কমাতে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। জরুরি পণ্য ও সেবার বাজারে একচেটিয়া প্রভাব ভাঙতে না পারলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমবে না। একই সঙ্গে দুর্নীতি, অপচয় ও জাতীয় সম্পদের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
করব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত করতে হবে। প্রকৃত সম্পদশালীদের করের আওতায় আনতে না পারলে রাষ্ট্রের পক্ষে সামাজিক সুরক্ষা ও জনসেবায় বড় বিনিয়োগ সম্ভব হবে না। বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ, গোপন বিনিয়োগ ও কর ফাঁকির বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারিও জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, উন্নয়নকে শুধু উৎপাদন বা অবকাঠামোর অগ্রগতি দিয়ে মাপলে চলবে না। উন্নয়ন তখনই সত্যিকার অর্থে অর্থবহ, যখন তা মানুষের জীবনে মর্যাদা, নিরাপত্তা, ন্যায় এবং সুযোগের ভারসাম্য আনে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এগোচ্ছে—এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এটাও স্পষ্ট যে ধনী আরও দ্রুত ধনী হচ্ছে, আর সমাজের নিচের স্তরের বিশাল জনগোষ্ঠী এখনও মৌলিক নিরাপত্তা, আয় ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নে লড়ছে। এই বৈষম্য যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে তা কেবল অর্থনৈতিক ফাঁক বাড়াবে না; সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা এবং গণতান্ত্রিক দুর্বলতাও বাড়াবে।
তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বণ্টনের প্রশ্নকে সামনে আনা। কারণ একটি দেশের সত্যিকারের শক্তি শুধু কত সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে, তা দিয়ে মাপা যায় না; বরং সেই সম্পদ কতটা ন্যায়সংগতভাবে মানুষের জীবনে পৌঁছেছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মাপকাঠি।

