প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো কক্সবাজার সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান। শনিবার (১৩ জুন) অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই এক দিনের সফরকে ঘিরে জেলাজুড়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা। শুধু রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থক নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও সফরটি নিয়ে আলোচনা চলছে। কারণ অনেকেই মনে করছেন, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও উপকূলীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের বিষয়ে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে আসতে পারে।
সফরসূচি অনুযায়ী, শনিবার সকালে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে পৌঁছে তিনি একাধিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।
দিনের শুরুতেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন তিনি। পরে বিকেলে চকরিয়া বাস টার্মিনাল এলাকায় স্থানীয় বিএনপির আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া সন্ধ্যায় একটি সুধী সমাবেশেও অংশ নেবেন সরকারপ্রধান। সফরের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কও পরিদর্শন করবেন তিনি।
এ সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দীর্ঘদিনের দাবি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি প্রশাসনিক উন্নয়ন প্রকল্পের সূচনা। কক্সবাজারবাসীর বহুদিনের প্রত্যাশা ছিল পেকুয়াকে পৌরসভা হিসেবে আরও শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনা এবং মাতামুহুরী এলাকায় নতুন উপজেলা গঠন। সফরকালে এসব উদ্যোগের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে।
কক্সবাজারের মানুষের কাছে এই সফর শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং উন্নয়ন প্রত্যাশার একটি বড় উপলক্ষ। জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বললে উঠে আসে অবকাঠামো, শিক্ষা, পর্যটন এবং অর্থনীতিকে ঘিরে নানা দাবি।
স্থানীয়দের অন্যতম প্রধান দাবি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করা। পর্যটন মৌসুমে এই সড়কে ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়, যা পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা উভয়ের জন্যই ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকের মতে, এই সড়কের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা গেলে কক্সবাজারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও গতি পাবে।
শিক্ষা খাতেও রয়েছে বড় প্রত্যাশা। দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, উচ্চশিক্ষার জন্য এখনো জেলার শিক্ষার্থীদের অন্য শহরে যেতে হয়, যা অনেক পরিবারের জন্য ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য।
এদিকে জেলার অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্ভর করে লবণ উৎপাদনের ওপর। তাই লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়টিও স্থানীয়দের দাবির তালিকায় রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও অনেক সময় কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত মূল্য পান না বলে অভিযোগ রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটও কক্সবাজারের জন্য একটি বড় বাস্তবতা। বছরের পর বছর বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ এবং নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলছে। ফলে তাদের নিজ দেশে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান জেলার বাসিন্দারা।
পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন নিয়েও রয়েছে নানা প্রত্যাশা। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর হিসেবে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বড় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এজন্য আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পূর্ণ ব্যবহার, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়নের দাবি দীর্ঘদিনের।
একইসঙ্গে জেলার ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্প সংরক্ষণ ও আধুনিকায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করেন, যথাযথ পরিকল্পনা ও সরকারি সহায়তা পেলে এই শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
উপকূলীয় এলাকার মানুষের আরেকটি বড় উদ্বেগের নাম ভাঙন ও জলবায়ু ঝুঁকি। বিশেষ করে কুতুবদিয়া এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। এছাড়া মহেশখালী ও কক্সবাজারের মধ্যে স্থায়ী সেতু নির্মাণের বিষয়টিও উন্নয়ন আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
সীমান্ত এলাকায় মাদক চোরাচালান বন্ধ এবং নিরাপত্তা জোরদারের দাবিও বারবার উঠে আসছে স্থানীয়দের কাছ থেকে। অনেকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ দেখতে চান।
সরকারপ্রধানের সফরকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে জেলায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সমাবেশস্থল, উন্নয়ন প্রকল্প এলাকা এবং সফরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শন করেছেন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। প্রশাসনও সফর নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজার শুধু একটি পর্যটন শহর নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ফলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম কক্সবাজার সফর রাজনৈতিক দিক থেকে যেমন তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করতে পারে।
এখন সবার নজর থাকবে সফর শেষে ঘোষিত পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতিগুলোর দিকে। কারণ কক্সবাজারের মানুষ শুধু সফর নয়, তাদের দীর্ঘদিনের দাবিগুলোর বাস্তব সমাধানও দেখতে চান।

