বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান এক বর্ণাঢ্য, অকুতোভয় ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব। তাঁকে রাজনীতির “চারণ কবি” হিসেবে বর্ণনা করা হয়। পেশায় একজন প্রথিতযশা আইনজীবী ফজলুর রহমানের রাজনীতির হাতেখড়ি ছাত্র আন্দোলনে, যেখানে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাধারণ সম্পাদকের মতো শীর্ষ পদে আসীন ছিলেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি কিশোরগঞ্জ জেলায় মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিব বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তি নির্মাণ করে দেয়। ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে কিশোরগঞ্জ-৩ আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। (কিছু সূত্র তাঁকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বললেও সংসদ-সদস্য তালিকাভিত্তিক কিছু সূত্রে তাঁকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে দেখানো হয়েছে)।
তবে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার সঙ্গে আদর্শিক দ্বিমত এবং দলের ভেতরে নীতিগত সংঘাতের কারণে তিনি অবহেলার শিকার হয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েন। পরবর্তীতে তিনি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনৈতিক বিবর্তনের ধারায় একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের দিকে চারদলীয় জোট সরকারের সময় তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন এবং দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৫০৩ ভোট পেয়ে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, যেখানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে প্রায় ৭৭ হাজার ৭০৪ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।
ফজলুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে অদ্বিতীয় দিক হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সংবিধানের প্রশ্নে তাঁর আপসহীন ও অবিসংবাদিত কণ্ঠ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যখন ইতিহাসের নতুন বয়ান তৈরির চেষ্টা করা হয়, তখন তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন যে—”মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনো আন্দোলনের তুলনা করা অন্যায়; মুক্তিযুদ্ধ মহাসমুদ্রের চেয়েও গভীর।”
৫ আগস্টের ঘটনা কোনো রাজনৈতিক বিপ্লব বা অভ্যুত্থান নয়, বরং এটি একটি “সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র” যা পর্দার আড়ালের এক “কালো শক্তি” পরিচালনা করেছে।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় জামায়াত-শিবিরকে ‘কালো শক্তি’ অভিহিত করে এবং ২০২৫ সালের ২৩ আগস্টের এক সাক্ষাৎকারে ৫ আগস্টের অস্থিতিশীলতার “সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র” বলে পুনরায় আলোচনায় আসেন, যার ফলে ২৫ আগস্ট ২০২৫ সাময়িকভাবে তাঁর দলীয় পদ স্থগিতও করা হয়। তবুও সংবিধানের সুরক্ষা, ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের মর্যাদা এবং রাজাকারের বংশধরদের আস্ফালনের বিরুদ্ধে ফজলুর রহমান নিজেকে একজন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা ও নির্ভীক সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
২০২৬ সালের (২৮ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে তিনি তাঁর এই অকুতোভয় ও নির্ভীক অবস্থানের নতুন অধ্যায় যুক্ত করেন।
তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। কোনো শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করলে এটা ডাবল (দ্বিগুণ) অপরাধ।
জুলাই অভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনার সমালোচনা করে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেন, এই কথাটা বলাই অন্যায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের তুলনা করা হচ্ছে; প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে কুয়া তুলনা করা।
তিনি বলেন, ‘তারা বলেছিল কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয় নাই। সাতচল্লিশে যুদ্ধ হয়েছে- চব্বিশে যুদ্ধ হয়েছে, সেইদিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বলেছিলাম, এই আল বদরের বাচ্চারা, এখনো কিন্তু ফজলুর রহমান জীবিত আছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধই সত্য। ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছেন এটাও সত্য। আমরা সেদিন তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলাম।’
তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “এ বাংলায় শুধু বেলি-চামেলি আর জুঁই ফুল ফোটে না, রক্তজবাও ফোটে। এ দেশে শুধু কোকিল ডাকে না, এ দেশের জঙ্গলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারও থাকে। যত দিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার থাকবে, মুক্তিযোদ্ধা জিতবে, রাজাকার কোনোদিন এই দেশে জয়লাভ করতে পারবে না।”
তিনি বক্তব্যে আরও বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করেন। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ফজলুর রহমান সংসদে নিজের আদর্শিক অবস্থানকে আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে।

