বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের প্রেক্ষাপটে আবারও আলোচনায় এসেছে সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি। গত ৭ জানুয়ারি আপিল বিভাগের প্রধান বিচারপতির এজলাসে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশ বন্ধ করা হলেও প্রায় চার মাস পরও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। এর প্রভাব এখন সুপ্রিম কোর্টের অন্য বেঞ্চগুলোতেও পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন আইনবিষয়ক সাংবাদিকরা।
আইন অঙ্গনের সাংবাদিকদের ভাষ্য, আগে নিয়মিতভাবে আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন বেঞ্চে উপস্থিত থেকে মামলার শুনানি, বিচারকদের পর্যবেক্ষণ এবং আইনজীবীদের সওয়াল-জবাব সরাসরি অনুসরণ করে সংবাদ সংগ্রহ করা হতো। কিন্তু নতুন প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার দুই দিন পরই ৭ জানুয়ারি এজলাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি।
এদিকে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচার হলেও দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এজলাসে সাংবাদিকদের প্রবেশ বন্ধ থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি হাসান জাবেদ বলেন, জানুয়ারি থেকে আইনবিষয়ক সাংবাদিকরা প্রধান বিচারপতির এজলাসে প্রবেশ করতে পারছেন না। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদনও করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসেনি।
তার ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেলের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করা হয়েছে। এমনকি প্রধান বিচারপতির সাক্ষাৎ চেয়েও অনুমতি মেলেনি। আইনমন্ত্রী, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতিকেও এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। হাসান জাবেদ আরও বলেন, সংবাদ সংগ্রহ করা সাংবাদিকদের সাংবিধানিক অধিকার। গণমাধ্যম রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তাই আদালতে সংবাদ সংগ্রহে দেওয়া বাধা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী এ বিষয়ে বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো নতুন সিদ্ধান্ত হয়নি। অর্থাৎ আগের নির্দেশনাই কার্যকর রয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলও সম্প্রতি এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, স্বাধীন গণমাধ্যমের কাজ নির্বিঘ্ন হওয়া উচিত এবং সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহে বাধার বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্ট মহলে তুলে ধরেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুবের মতে, বর্তমানে সংবেদনশীল অনেক মামলার বিচার ট্রাইব্যুনালে সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে। সেই বাস্তবতায় আদালতকক্ষে সাংবাদিকদের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তির কারণ স্পষ্ট নয়। সাংবাদিক নেতারাও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, প্রধান বিচারপতি সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করবেন বলেই তারা আশা করছেন।
সাংবাদিকদের সংগঠন ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম ইতোমধ্যে এ বিষয়ে একাধিকবার লিখিত আবেদন করেছে। গত ২৯ জানুয়ারি পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, সাংবিধানিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মামলার তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে আদালতে সাংবাদিকদের উপস্থিতি জরুরি। আদালত সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এবং জনগণকে নির্ভুল তথ্য জানাতে গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকা অপরিহার্য।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সংবিধানের ৩৫ ও ৩৯ অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫২ ধারায় উন্মুক্ত আদালত ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বিধিতেও প্রকাশ্য আদালতে রায় ও আদেশ প্রদানের কথা বলা আছে।
ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের দাবি, দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর ধরে সাংবাদিকরা প্রকাশ্য আদালতে উপস্থিত থেকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মামলার সংবাদ সংগ্রহ করে আসছেন। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন এজলাসে প্রবেশে বাধা তৈরি হওয়ায় সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার ব্যাহত হচ্ছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য উদ্বেগের বিষয়।

