জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সারা দেশে সহিংসতার ঘটনায় করা মামলাগুলোয় ঢালাওভাবে আসামি করার অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলায় আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও কারামুক্তি মিলছে না অনেক আসামির। জামিনের পর কারামুক্তির আগেই দেখানো হচ্ছে অন্য কোনো মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট। এমন ঘটনা অহরহ।
কাগজে-কলমে জামিন, মানে মুক্তি নিশ্চিত হলেও বাস্তবে কারাগারের দরজা খুলতে লাগছে পাঁচ স্তরের অদৃশ্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স। অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, জামিন, কারামুক্তি ও শ্যোন অ্যারেস্ট ঘিরে প্রতিটি ধাপেই অনিয়ম ও বাণিজ্যের অভিযোগ। রাজধানীর বিভিন্ন থানার ২০টি মামলা বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
আইনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিআরপিসি অনুযায়ী এবং সুপ্রিমকোর্টের বিভিন্ন নজির অনুযায়ী আদালত জামিন মঞ্জুর করার পর তা কার্যকর করা প্রশাসনের দায়িত্ব। জামিন পাওয়া আসামিকে অযথা কারাগারে আটকে রাখা বা কারামুক্তিতে বিলম্ব আইনের পরিপন্থি। যার ফলে প্রশ্ন উঠছে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, জামিন আদেশ জারির পর আসামিকে মুক্তি পেতে ক্লিয়ারেন্সের জন্য প্রথমে ডিসি প্রসিকিউশন, বিভাগীয় পুলিশ কার্যালয়, গোয়েন্দা বিভাগ, সংশ্লিষ্ট থানা হয়ে আবার কারাগারে পাঠানো হয়। এই সুযোগে এসব অদৃশ্য ক্লিয়ারেন্স ঘিরে অভিযোগ উঠেছে ঘুস লেনদেনের। ভুক্তভোগীদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে অসাধু পুলিশ কর্মকর্তারা এ প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে কার্যত জিম্মি করে অর্থ আদায় করছেন। বিশেষ করে রাজনৈতিক মামলার আসামিদের কাছ থেকে। অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনে সহিংসতায় জড়িত ছিলেন-এমন আসামিদের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের মাধ্যমে মামলা থেকে অভ্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
জামিন পেলেও মিলছে না কারামুক্তি: অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জামিন পেলেও সহজেই আসামিদের মুক্তি মিলছে না। কারামুক্তির জন্য তৈরি হয়েছে ‘পুলিশের পাঁচ স্তরের ক্লিয়ারেন্স’ প্রক্রিয়া। প্রথমে আদালতের জামিন আদেশ ডিএমপির ডিসি প্রসিকিউশন হয়ে কারাগারে পৌঁছায়। এরপর সেটি যায় বিভাগীয় পুলিশের কার্যালয়, সেখান থেকে যায় সংশ্লিষ্ট থানায়। সবশেষে আবার কারাগারে ফিরে আসে নিশ্চিতকরণের জন্য। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি স্তরেই ঘুস লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ‘একেকটি ধাপ পার হতে আলাদা করে ‘ম্যানেজ’ করতে হয়। না হলে পরবর্তী সময়ে অন্য মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। যার ফলে আসামি কারামুক্ত হতে পারেন না।
জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ: অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা ও দালালচক্র এই ‘ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া’কে জিম্মি করে অর্থ আদায় করছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক মামলার আসামিদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের এসব ক্লিয়ারেন্সের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়।
ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি বলেন, রাজনৈতিক মামলায় কাউকে আটক করার পর জামিন পেলেও সরাসরি কারামুক্তি পাওয়া খুব সহজ হয় না। থানাকে ম্যানেজ না করতে পারলে কেউ বের হতে পারেন না। যদি সেটা না করা হয়, তাহলে নতুন করে অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। কখনো একই থানায়, আবার কখনও পাশের থানায় মামলা দেওয়া হয়, যাতে মুক্তি আটকে যায়। আমি যাদের দেখেছি, তারা প্রায় সবাই এভাবে ম্যানেজ করেই বের হয়েছেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, পুরো প্রক্রিয়া এমনভাবে চলে যে, জামিন পাওয়ার পর আসামির স্বজনরা কারাগারের গেটে গিয়ে জানতে পারেন আরেকটি মামলায় তার শ্যোন অ্যারেস্ট আছে। তখন আবার শুরু হয় নতুন দৌড়ঝাঁপ।
কেস স্টাডি: রাজধানীর শাহজাহানপুর থানার একটি বৈষম্যবিরোধী মামলায় গ্রেফতার হওয়া এক মাংস ব্যবসায়ী আদালত থেকে জামিন পান। কিন্তু জামিন পেলেও তিনি কারাগার থেকে বের হতে পারেন না। স্বজনরা কারাগারে তার মুক্তির জন্য গেলে জানতে পারেন তাকে অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে। এমন করে কয়েকটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় তাকে। পরবর্তী সময়ে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানাকে ম্যানেজ করে কারামুক্ত হন। এমন ঘটনা আদালতে অহরহ।
তিনি বলেন, আমাকে ব্যবসায়িক দন্দ্বে গ্রেফতার করা হয়। পরে যখন আদালত থেকে জামিন পাই, তখন অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এভাবে ৩টি মামলায় আমাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। পরে থানা ম্যানেজ করে কারামুক্ত হই। আইনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহির আওতায় না আনলে এ অনিয়ম বন্ধ হবে না। আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালুর পরামর্শ দিয়েছেন তারা। জামিন একটি সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার যদি প্রশাসনিক স্তরে ‘বাণিজ্যে’ পরিণত হয়, তাহলে তা শুধু ব্যক্তির নয়-পুরো বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ধ্বংস করে।
অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন ঘিরে ‘বাণিজ্য’: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করেননি-এমন বহু নিরপরাধ ব্যক্তিকে আসামি করার অভিযোগ রয়েছে। একশ্রেণির কুচক্রী ও আইনজীবী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য মামলায় তাদের নাম ঢুকিয়েছে। এ কারণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি বন্ধে ফৌজদারি কার্যবিধিতে ধারা ১৭৩-এর (ক) সংযোজন করেছে। যার উদ্দেশ্য হলো তদন্তাধীন মামলাগুলো পর্যালোচনার মাধ্যমে নিরপরাধ ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ‘অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন’ ঘিরে হচ্ছে বাণিজ্য। এই ধারার সুযোগ নিয়ে নিরপরাধ ব্যক্তিদের পাশাপাশি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের পদ-পদবি আছে-এমন আসামিদের মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। সূত্রের কাছে এমন বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব সুপারিশের পেছনেও রয়েছে অর্থের লেনদেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের মুখপাত্র এনএম নাসিরুদ্দিন বলেন, আদালত থেকে জামিন হওয়ার পর কারাগার থেকে মুক্তি পেতে পুলিশের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না-এটা আমাদের কাছেও প্রশ্নের বিষয়। তবে এ বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো ক্লিয়ারেন্স নেওয়ার নিয়ম নেই। আদালত যদি জামিন দেন, তাহলে আদালতের আদেশ অনুযায়ীই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন-এটাই প্রচলিত প্রক্রিয়া।
অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে বাণিজ্য বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি পদ-পদবিধারী হলেই তাকে ভিন্নভাবে দেখা হয় না। মামলার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা আছে কি না, সেটির ভিত্তিতেই তদন্ত কর্মকর্তা রিপোর্ট দেন। এ ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা অবশ্যই তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
সূত্র: যুগান্তর

