একটি দেশের অর্থনীতি শুধু নীতি বা বিনিয়োগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং তথ্যের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণের ওপরও সমানভাবে নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাধীন গণমাধ্যম না থাকলে অর্থনৈতিক দুর্বলতা আরও গভীর হয়, কারণ দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
গবেষণা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, যেসব দেশে সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল থাকে। বিপরীতে, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত হলে প্রকৃত তথ্য আড়াল হয়, ফলে নীতিনির্ধারণে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এতে দীর্ঘমেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্নীতি ও তথ্য গোপনের পরিবেশে ব্যাংকিং খাত, রাজস্বনীতি এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে ঋণখেলাপি বৃদ্ধি, বিনিয়োগে আস্থার সংকট এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হয়। এসবই অর্থনীতিকে আরও ভঙ্গুর করে তোলে।
গণমাধ্যমকে অনেক সময় অর্থনীতির ‘পাহারাদার’ হিসেবে দেখা হয়। কারণ তারা সরকারের নীতি, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম বা বড় প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই প্রশ্ন তোলার ক্ষমতাই দুর্নীতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। যেখানে এই ভূমিকা দুর্বল হয়, সেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমে গেলে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় এক থেকে দুই শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। কারণ তথ্যের ঘাটতি থাকলে বিনিয়োগকারী, নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষ—সবাই ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।
ব্যাংকিং খাতের উদাহরণেও একই চিত্র দেখা যায়। স্বচ্ছ গণমাধ্যম ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে নজরদারি বাড়ায়, অনিয়ম প্রকাশ করে এবং ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। বিপরীতে, তথ্য গোপন থাকলে ঋণ অনিয়ম ও অর্থপাচারের সুযোগ বেড়ে যায়, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ডিজিটাল যুগে ভুল তথ্য ও গুজব অর্থনীতিকে নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাই শুধু সরকারি নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং স্বাধীন ও পেশাদার সাংবাদিকতা প্রয়োজন, যা সত্য তথ্য যাচাই করে জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারে।
বিশ্বের তুলনামূলক উদাহরণেও দেখা যায়, যেসব দেশে সংবাদমাধ্যম স্বাধীন, সেসব দেশ দুর্নীতির সূচকে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকে। সেখানে সরকারি খরচ, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বেশি থাকে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংকিং দুর্বলতা এবং বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার মতো চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এই অবস্থায় স্বাধীন গণমাধ্যম একটি নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল নীতি সংস্কার বা বাজেট ব্যবস্থাপনা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি স্থিতিশীল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী জবাবদিহি কাঠামো, যেখানে গণমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে। সব মিলিয়ে বলা যায়, স্বাধীন গণমাধ্যম শুধু গণতন্ত্রের জন্য নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য। তথ্যের স্বচ্ছ প্রবাহ নিশ্চিত না হলে কোনো অর্থনীতিই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে পারে না।

