টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরের ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে দুই জেলার কৃষকেরা ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সুনামগঞ্জে হাজার কোটি টাকার ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে হবিগঞ্জে অনেক কৃষক একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় ২০ হাজার ৬০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে হাওর এলাকায় আবাদ ছিল ৭৭ শতাংশ এবং নন-হাওর এলাকায় ৬৫ শতাংশ। গত সোমবার দুপুর পর্যন্ত হাওরের প্রায় ২৩ শতাংশ ধান এখনো মাঠে রয়ে গেছে কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে ধান কাটা, শুকানো এবং মাড়াইয়ের কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক জানান, বৃষ্টির কারণে কৃষকেরা ধান সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে মাড়াই ও শুকানোর কাজও থমকে আছে। তার হিসাবে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে বাস্তবে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। হাওরের কৃষকেরা বলছেন, প্রায় সব হাওরের ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। যে ধান কেটে আনা হয়েছে, সেটিও খলায় পচে যাচ্ছে।
দেখার হাওরপাড়ের লীলপুর এলাকার ৭০ বছর বয়সী কৃষক জমিরুল হক বলেন, তার চার ভাগের মধ্যে এক ভাগ ধান কেটে আনা গেলেও বাকি তিন ভাগ এখন ৬ থেকে ৮ ফুট পানির নিচে। তার ভাষায়, এই ধান আর উদ্ধার করা সম্ভব নয়।
হাওর নেতা ও হাওর-নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, সরকারি হিসাবেই যদি ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়, তাহলে বাস্তবে তা কয়েক গুণ বেশি হবে। তার মতে, ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকার নিচে নয়। তিনি আরও বলেন, কাটা ও মাড়াই করা ধানের ক্ষতির হিসাব এখনও পুরোপুরি ধরা হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে।
এদিকে এক দিনের সামান্য রোদ মিললেও পরদিন ভোর থেকেই আবারও বৃষ্টি শুরু হয়। এতে নতুন করে হাজার হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান পানির নিচে চলে যায়। সুরমা নদীসহ যাদুকাটা, চেলা ও খাসিয়ামারা নদীর পানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, আগামী কয়েক দিন ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। সাময়িক রোদ হলেও তা স্থায়ী হবে না এবং পাহাড়ি ঢলও নামবে।
হবিগঞ্জেও টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জেলার বিস্তীর্ণ হাওরের ফসলি জমি পানির নিচে চলে গেছে। পাশাপাশি রোদের অভাবে কাটা ধান শুকাতে না পারায় তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আজমিরীগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর গ্রামের কৃষক গউছ মোড়ল বর্গা নিয়ে ২০ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। পানি বাড়তে শুরু করলে তিনি তড়িঘড়ি করে ১০ বিঘার ধান কেটে মাড়াই করেন। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে সেই ধান শুকাতে না পেরে নষ্ট হয়ে যায় এবং সেখানে নতুন চারা গজায়। বাকি ১০ বিঘার ধান এখনো পানির নিচে। গউছ মোড়ল এখন ঋণ ও পরিবারের খরচ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছেন।
হাওর এলাকার প্রায় প্রতিটি কৃষকের চিত্র একই রকম। কেউ কোমরপানি, কেউ বুকপানি ভেঙে ধান কাটার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। অনেক জায়গায় শ্রমিক সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পানি বাড়তে থাকায় এই ক্ষতি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। টানা ৮ থেকে ১০ দিনের বৃষ্টিতে মাড়াই করা ধান শুকাতে না পেরে অনেক জায়গায় পচে গেছে। বৈশাখের স্বাভাবিক ধানের গন্ধের পরিবর্তে এখন বাতাসে ছড়াচ্ছে পচা ধানের দুর্গন্ধ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) দ্বীপক কুমার দাশ জানান, ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ও ক্ষতির হিসাব আরও বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০ হাজার কৃষকের তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জের সব নদীর পানিই বাড়ছে। সুতাং নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। খোয়াই ও কুশিয়ারা নদীর পানিও বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থায় রয়েছে। এদিকে সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। এ বছর জেলায় ৭ হাজার ৯০ মেট্রিক টন ধান এবং ১৭ হাজার ২২০ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

