রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক ও জল্পনা তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর একাংশ তাকে আওয়ামী লীগ আমলের নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে সমালোচনা করলেও সরকার এখন পর্যন্ত তাকে সরানোর কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। বরং সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার যুক্তিতে রাষ্ট্রপতির প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন ধরে রেখেছে ক্ষমতাসীন মহল।
সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ক্ষমতার সমীকরণে তিনি শেষ পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদে থাকতে পারবেন কি না, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের দাবি ওঠে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সরকারবিরোধী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে। তাদের অভিযোগ, তিনি আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু রাজনৈতিক ঘটনার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেননি। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগসংক্রান্ত বক্তব্য নিয়ে বিরোধী দলগুলো রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরেও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। বিরোধী দলের সদস্যরা তার বক্তব্যের বিরোধিতা করেন এবং তাকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা করেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি ও জামায়াতসহ কয়েকটি দল প্রকাশ্যে তার পদত্যাগ দাবি করে। কেউ কেউ তাকে “ফ্যাসিবাদের সহযোগী” বলেও মন্তব্য করেন।
তবে রাজনৈতিক বিরোধিতা বাড়লেও সরকারের অবস্থান এখনো ভিন্ন। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে রাষ্ট্রপতিকে পূর্ণ প্রটোকল দেওয়া হচ্ছে। স্বাধীনতা দিবস, শহীদ দিবস, পিলখানা স্মরণ অনুষ্ঠান এবং ঈদের জামাতসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে একসঙ্গে দেখা গেছে। এতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, সরকার আপাতত রাষ্ট্রপতিকে সরানোর পথে হাঁটছে না।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এর পেছনে বড় কারণ সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা। কারণ রাষ্ট্রপতির পদ দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নতুন করে রাষ্ট্রপতি অপসারণ বা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর একটি অংশ অবশ্য মনে করে, বর্তমান রাষ্ট্রপতি নৈতিক অবস্থান হারিয়েছেন। তাদের মতে, অতীত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় তার দায়িত্বে থাকা উচিত নয়। অন্যদিকে সরকারি দলের ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, সাংবিধানিক পদের বিষয়ে আবেগ নয়, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। সংসদ সদস্যদের ভোটে তিনি নির্বাচিত হন এবং তার মেয়াদ পাঁচ বছর। একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুইবার রাষ্ট্রপতি হতে পারেন। রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হলে বা মেয়াদ শেষ হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নতুন নির্বাচন আয়োজনের বিধান রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই সরকারের রাজনৈতিক কৌশলের ওপর নির্ভর করছে। সরকার যদি মনে করে তাকে বহাল রাখা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, তাহলে তিনি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেন। আবার রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেলে পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হতে পারে।
এদিকে বিরোধী দলগুলো রাষ্ট্রপতির বিষয়ে সরব থাকলেও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো বিতর্কে জড়াতে চায়নি। ফলে আপাতত তিনি দায়িত্বে বহাল থাকছেন। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে তাকে ঘিরে বিতর্ক যে দ্রুত শেষ হচ্ছে না, সেটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

