বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গণমাধ্যম প্রায় একই ধরনের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস। তার মতে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সুশাসনের ঘাটতি, রাজনৈতিক চাপ এবং দুর্নীতির বাস্তবতা পুরো অঞ্চলজুড়েই অনেকটা একই রকম।
রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর এক আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। দুই দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, সম্পাদক ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা অংশ নেন। আলোচনার মূল বিষয় ছিল রাজনৈতিক কাঠামো, সুশাসন ও স্বাধীন গণমাধ্যমের সম্পর্ক।
জাফর আব্বাস বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুনতে গিয়ে তার মনে হয়েছে যেন পাকিস্তানের চিত্রই তুলে ধরা হচ্ছে। তার মতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে রাজনৈতিক মেরুকরণ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য গণমাধ্যমের স্বাধীন কাজকে কঠিন করে তুলছে। একই বাস্তবতা ভারতসহ অন্য দেশগুলোতেও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রবীণ এই সাংবাদিক বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার গণমাধ্যমে বড় শহর, রাজনৈতিক সংঘাত এবং ক্ষমতার লড়াই বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও অবহেলিত মানুষের বাস্তবতা অনেক সময় সংবাদ কাভারেজের বাইরে থেকে যায়। এতে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সংকট আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।
তিনি মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। সাংবাদিকেরা নিজেদের ভূমিকা ও দায়িত্ব নতুনভাবে মূল্যায়ন করলে গণমাধ্যম আরও শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল হতে পারে।
জাফর আব্বাসের ভাষ্য, শুধু সরকারের সমালোচনা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সমাজের সামগ্রিক বাস্তবতাও গণমাধ্যমকে বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ গণমাধ্যম, রাষ্ট্র এবং সমাজ—এই তিনটি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। সাংবাদিকতার লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের বাস্তব সমস্যাগুলো সামনে আনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
তিনি আরও বলেন, উন্নত পশ্চিমা দেশের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার তুলনা সবসময় বাস্তবসম্মত নয়। কারণ ইউরোপের অনেক দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে। তাই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিজেদের বাস্তবতা ও অভিন্ন চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সুশাসনের পথ খুঁজতে হবে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া অন্য বক্তারাও দক্ষিণ এশিয়ায় গণমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্বল হয়ে পড়লে গণতন্ত্র ও জবাবদিহির ক্ষেত্রও সংকুচিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার সংবাদমাধ্যম সবচেয়ে বড় যে সংকটের মুখে রয়েছে, তা হলো স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ ধরে রাখা। রাজনৈতিক চাপ, মালিকানাগত স্বার্থ, ডিজিটাল বিভ্রান্তি এবং বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার মধ্যে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা বজায় রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
সম্মেলনে অংশ নেওয়া বক্তারা মনে করেন, আঞ্চলিক সহযোগিতা, পেশাগত নৈতিকতা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার চর্চা জোরদার করা গেলে দক্ষিণ এশিয়ার গণমাধ্যম ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও শক্ত অবস্থান নিতে পারবে।

