দেশে চলমান হাম–রুবেলা প্রতিরোধ টিকাদান কর্মসূচিতে এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৭৬ লাখেরও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৮ শতাংশ অর্জিত হলেও শহরাঞ্চলে টিকা গ্রহণে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। বিশেষ করে বস্তি ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো টিকার বাইরে রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
শনিবার বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। আলোচনায় ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক জানান, এবারের ক্যাম্পেইনে মোট লক্ষ্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশু। এর মধ্যে বড় একটি অংশ টিকা পেলেও শহর এলাকায় এখনো ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ শিশু কোনো ধরনের টিকার আওতায় আসেনি। তুলনামূলকভাবে গ্রামাঞ্চলে এই হার কিছুটা কম, প্রায় ১৫ শতাংশ শিশু টিকা বঞ্চিত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচিতে সামগ্রিক সাফল্য থাকলেও শহরাঞ্চলের পিছিয়ে থাকা অংশটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। ফলে টিকা কাভারেজে এই বৈষম্য জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আলোচনায় আরও জানানো হয়, রুটিন টিকাদান ব্যবস্থাতেও ঘাটতি রয়ে গেছে। হামের প্রথম ডোজের কাভারেজ প্রায় ৮৬ শতাংশ হলেও দ্বিতীয় ডোজে তা নেমে এসেছে ৮১ শতাংশে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবধান দীর্ঘমেয়াদে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় দুর্বলতা তৈরি করতে পারে এবং মাঝে মাঝে রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়ায়।
সম্প্রতি দেশে হামের কারণে প্রায় তিনশ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এ পরিস্থিতিকে শুধুই ক্যাম্পেইন নির্ভর না রেখে নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি তথ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে সময়মতো ঝুঁকি শনাক্ত না হওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে আলোচনায়।
স্বাস্থ্য খাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রোগ নির্ণয় ও পরীক্ষার সুবিধা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকায় অনেক সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। তাই প্রতিটি বিভাগে পরীক্ষাগার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাগুলোর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার আশ্বাসও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, টিকাদানের লক্ষ্য পূরণ করলেই হবে না, টিকার বাইরে থাকা শেষ অংশটুকু জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শহরের অনানুষ্ঠানিক বসতি এলাকায় সচেতনতা ও পৌঁছানোর ব্যবস্থা জোরদার না হলে লক্ষ্য পূরণ হলেও ঝুঁকি থেকেই যাবে।
আলোচনায় জানানো হয়, টিকাদানের কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অন্তত ৯৫ শতাংশ কাভারেজ প্রয়োজন, যা হার্ড ইমিউনিটি হিসেবে পরিচিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য অর্জনে আরও সমন্বিত উদ্যোগ দরকার বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়, যাতে কোনো শিশু টিকার বাইরে না থাকে।

