বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী জাপান বৈদেশিক ঋণের সুদের হার বাড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য পরিচিত দেশটির নতুন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ভবিষ্যৎ ঋণ গ্রহণ এখন আগের তুলনায় ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ঢাকায় জাপান দূতাবাস সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছে, জাপান সরকার তাদের বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ঋণের সুদের হার ও শর্ত পুনর্বিবেচনা করেছে। নতুন হার ও শর্ত ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, জাপান সাধারণত বিশেষ অগ্রাধিকারভিত্তিক, অগ্রাধিকারভিত্তিক এবং সাধারণ—এই তিন ধরনের প্রকল্পে ঋণ দেয়। এসব ঋণের কিছু স্থির সুদে, আবার কিছু পরিবর্তনশীল সুদে দেওয়া হয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রায় সব ধরনের ঋণেই সুদের হার বেড়েছে।
সাধারণ জাপানি ঋণের ক্ষেত্রে গত বছর যেখানে স্থির সুদের হার ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ, এখন তা বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ সুদের হার বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। একইভাবে অন্যান্য বিকল্প সুদহারেও একই হারে বৃদ্ধি এসেছে। আগে সর্বনিম্ন হার ছিল ২ শতাংশ, এখন তা দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭ শতাংশে।
শুধু সুদ নয়, জাপানি পরামর্শকদের সেবামূল্যও বাড়ানো হয়েছে। তবে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ও গ্রেস পিরিয়ড অপরিবর্তিত রয়েছে। সাধারণত এসব ঋণ ১৫ থেকে ৪০ বছরে পরিশোধ করতে হয় এবং ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড থাকে।
নতুন সুদের হার কার্যকর হওয়ার পর সরকার ইতোমধ্যে তিনটি প্রস্তাবিত প্রকল্প ফেরত পাঠিয়েছে। প্রকল্পগুলো হলো উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্প, হাওর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উন্নয়ন প্রকল্প। এগুলো আগামী অর্থবছরে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল।
ইআরডির কর্মকর্তাদের মতে, বাড়তি সুদে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে না। তাই প্রকল্পগুলো পুনর্বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ইআরডির অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, নতুন পরিস্থিতিতে সরকার জাপানি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক অবস্থানে যাচ্ছে। এখন থেকে এমন প্রকল্পকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যেগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক সুফল বেশি পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং যমুনা রেলসেতুসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পে জাপান অর্থায়ন করেছে। এসব প্রকল্পে জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
গত বছর জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ডাবল রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পে জাপানের সঙ্গে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার ঋণচুক্তি হয়। সে সময় সুদের হার ছিল ২ শতাংশ। এখন একই ধরনের ঋণে আরও বেশি সুদ গুনতে হবে বাংলাদেশকে।
তবে দুইটি বড় প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তিও তৈরি হয়েছে। মেট্রোরেল-১ প্রকল্পে জাইকার শর্তের কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনায়ও জাপানের আগ্রহ নিয়ে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বড় উৎসগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও জাপান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ১৮ শতাংশ জাপানের কাছ থেকে নেওয়া। বিশ্বব্যাংকের আইডিএ থেকে এসেছে ২৯ শতাংশ এবং এডিবি থেকে ২৩ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংক ও এডিবির ঋণের সুদ এখনো তুলনামূলক কম। তবে বিশেষ শর্তে নেওয়া ঋণে সুদের হার ৪ শতাংশের বেশি হয়ে যায়। অন্যদিকে রাশিয়ার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ঋণের সুদও প্রায় ৪ শতাংশ। চীনা ঋণের সুদ তুলনামূলক কম হলেও পরিশোধের সময়সীমা কম হওয়ায় চাপ বেশি থাকে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর থেকেই সহজ শর্তের ঋণের সুযোগ কমতে শুরু করেছে। এখন উন্নয়ন সহযোগীরা ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক সুদের দিকে ঝুঁকছে। ফলে ভবিষ্যতে বিদেশি ঋণের খরচ আরও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, সহজ শর্তের ঋণের যুগ ধীরে ধীরে শেষ হচ্ছে। তাই এখন থেকে ঋণনির্ভর প্রকল্প বাছাইয়ে আরও সতর্ক হতে হবে। সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানও একই মত দিয়েছেন। তার মতে, শুধু অবকাঠামো নয়, এমন প্রকল্প নিতে হবে যেগুলো দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ অবদান রাখবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৯ লাখ কোটি টাকার সমান। শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল বাবদ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের চাপ এবং বাড়তি সুদের কারণে আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের বোঝা আরও বাড়তে পারে। তাই এখন থেকেই উচ্চ অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করতে পারে—এমন প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

