নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে ঘিরে একের পর এক মামলার জটিলতায় নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এক মামলায় জামিন পাওয়ার পর আরেক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে তাঁকে। ফলে আদালত থেকে বারবার জামিন মিললেও বাস্তবে কারামুক্ত হতে পারছেন না এই সাবেক মেয়র। গত এক বছরে তাঁর বিরুদ্ধে মোট ১২টি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ মামলার এজাহারেই তাঁর নাম ছিল না বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা গেছে।
গত বছরের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকার বাসা থেকে আইভীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর প্রথম দফায় তিনটি হত্যা ও দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। নিম্ন আদালতে জামিন না পেয়ে পরে তিনি হাইকোর্টে আবেদন করেন। গত বছরের নভেম্বরে হাইকোর্ট পাঁচ মামলায় তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। তবে সেই জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে গেলে চেম্বার আদালত জামিন স্থগিত করেন। পরে বিষয়টি নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠানো হয়, যা এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
আইভীর আইনজীবীদের অভিযোগ, প্রথম পাঁচ মামলায় জামিনের আদেশ হওয়ার দিনই আরও পাঁচ মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করে পুলিশ। আদালত সেটিও মঞ্জুর করেন। নতুন এসব মামলার মধ্যে চারটি হত্যা মামলা এবং একটি সরকারি কাজে বাধা ও হামলার অভিযোগসংক্রান্ত মামলা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব মামলার এজাহারেও তাঁর নাম ছিল না।
দ্বিতীয় দফার মামলাগুলোতেও নিম্ন আদালতে জামিন না পেয়ে হাইকোর্টে যান আইভী। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্ট তাঁকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। কিন্তু এখানেও একই চিত্র দেখা যায়। রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে চেম্বার আদালত সেই জামিনও স্থগিত করেন।
এর মধ্যেই সিদ্ধিরগঞ্জ থানার আরও দুটি হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মার্চ ও এপ্রিলে পৃথক আদেশে আদালত এসব আবেদনে সম্মতি দেন। পরবর্তীতে ওই দুই মামলায়ও হাইকোর্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান আইভী। তবে রাষ্ট্রপক্ষ সেই জামিনও স্থগিত চেয়ে আবেদন করেছে। শুনানি এখনো হয়নি।
আইনজীবীরা বলছেন, ধারাবাহিকভাবে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কারণে আইভীর মুক্তির পথ দীর্ঘ হচ্ছে। তাঁদের দাবি, এটি আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক হয়রানির শামিল। এই পরিস্থিতিতে সর্বশেষ দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন আইভী। রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত তাঁকে সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া নতুন করে গ্রেপ্তার না দেখানো এবং হয়রানি না করার নির্দেশ দেন।
হাইকোর্টের রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে, শুধু হয়রানি বা অপদস্থ করার উদ্দেশ্যে বারবার মামলায় জড়ানোর কার্যক্রম কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আইভীর বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোর বেশির ভাগই ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলা। এর বাইরে রয়েছে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে একটি মামলা। তবে এসব মামলার কয়েকজন বাদীর বক্তব্য নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
একটি হত্যা মামলার বাদী মিনারুলের ভাই দাবি করেছেন, তিনি মামলার আসামিদের কাউকে চিনতেন না। থানায় উপস্থিত কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি ও পুলিশের পরামর্শে মামলার এজাহারে নাম যুক্ত করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন আরেক মামলার বাদী চাঁদ মিয়াও। তাঁর দাবি, ভাতার কার্ড ও আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়ে তাঁকে মামলা করতে উৎসাহিত করা হয়েছিল।
এসব অভিযোগের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার বলেছেন, কেউ অভিযোগ নিয়ে আবেদন করলে তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে সম্পৃক্ততা না পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে আইভীর পরিবারের সদস্যরা পুরো ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের দাবি, দলীয় রাজনীতির ভেতরে থেকেও তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেই কারণেই তাঁকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক মামলা দেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জের অন্যতম পরিচিত মুখ। পৌর মেয়র থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশনের টানা তিনবারের নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তবে এখন একের পর এক মামলা ও জামিন জটিলতায় তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যেমন অনিশ্চয়তায় পড়েছে, তেমনি বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

